Muhurto…ebong amra.

বর্ষ পূর্তির মনখারাপ নাকি কয়েকটা সাজানো মুহুর্তের কোলাজ

কি একটা গান আছে না “মুহুর্ত বলুক”?
সেই এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক?
নিরেট পাগল নাকি গোছানো সংসারী 
এক্সেল শিটের কোন দ্রাঘিমাংশে তোমার গুপ্তকুঠুরি?

আসলে এ সবি চর্বিতচর্বন
সেই কোন বিকেলের এক পাথরকুচি ফুলের গন্ধমাখা আমি 
কি যেন বলতে “মুহুর্ত গুলোই সব”

অভিমানের আগমনীর সুর তাই আমার কাছে কেটে যায় বার বার
আঁচটা লাগে এখনও
যদি ভাব এ এক পাগলামি ভুল ভাববে হয়ত
একটা নিস্তেজ বিকেলের সূর্যাস্ত মানেই কি নিষ্ঠুর অন্ধকার?

তুমি কি বলতে জানিনা,  
মুহুর্তগুলোর অধিকারে বলতে পারি আমি বলতাম স্নিগ্ধতা...
Advertisements


ঝড় উঠেছে। কালবৈশাখী নাকি?
কি জানি। অমল আসবে মনে হয়।
তুই এখনও আশা রাখিস?
কেন? ফ্রিজ ফ্রেমের শটটা খুব ওপর চালাকি না?
তারপর?
তারপর সবকিছু লেখা হয়ে থাকে নাটকে নভেলে
আর পন্ডিতের চুলচেরা বিশ্লেষনে।
আর চারু?


P.S. This is what happens when a lonely afternoon beckons you 😀

Ekti Oporinoto golpo

This is my second attempt to write down something in Bangla in my blog. Don’t quite like the flow myself. And there are spelling errors, still, albeit less than the first time. Any kind of feedback is always welcome. Like it, hate it or just “forget it”- do leave a comment 🙂

একটি অপরিনত গল্প

আমাদের প্রত্যেকের কৈশোরবয়সের সাথে এমন কোনো না কোনো গল্পকথা জড়িয়ে আছে যা আমরা ভুলে থাকতে চাই বা ভুলে থাকার অভিনয় করি। এই প্রত্যেকটি ঘটনাপ্রবাহ ই যে অসুন্দর বা বিশ্রী এমন নয়। তবুও কিছু জিনিস ঘটতেই থাকে। তাকে আটকানোর প্রয়াস না আমরা করি, না করতে চাই। নন্দিনী এবং সুখলতার গল্পটাও অনেকটা এই একই চেনা ছকে বাঁধা।
বালিগঞ্জের উঁচু স্কুলবাড়িটার সামনে ছুটির সময় অনেক নামি দামি দেশী বিদেশী গাড়ির দেখা মেলে। এই স্কুলে সমাজের যে শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরা পড়তে আসে তাদের অভিভাবকরা এরকম গাড়ি চালাবেন তাই শোভনীয়। দামি স্কুল, দামি ইউনিফরম এবং তার থেকেও দামি এখানকার ঠাঁটবাট।
মে মাসের এই প্যাচপ্যাচে গরমের মধ্যে এসি গাড়ির বিলসিতা ছেড়ে রাস্তায় নামতে নন্দিনীর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু তোজোর কেন এতও দেরী হচ্ছে আজ তাও ভেবে পাচ্ছিল না নন্দিনী। সামনের শীতে ছয়ে পা দেবে তোজো। ক্লাস ওয়ান হয়ে যাবে। সত্যি সময়ের থই পাওয়া মানুষের কম্ম নয়। এই সেদিনই তো সবে স্কুলে ভরতি হল। উফ! ছেলেমেয়ে ভরতি হবে না কি বাবা মার পরীক্ষা তা বঝে ওঠা দুষ্কর। নিজের মাধ্যমিকের সময়ও বোধহয় এত টেনশন্‌ করেনি নন্দিনী। প্রথমে একবার জয়ন্তকে বলেওছিল যে যদি এখানে চান্স নাও বা পায় তাহলেও বা ক্ষতি কি? কলকাতায় কি ভাল স্কুলের অভাব?
কিন্তু জয়ন্ত বুঝিয়ে দিয়েছিল যে বংশ গরিমা রক্ষা করতে বাপ-ঠাকুরদাদা যে স্কুলে পড়েছে সেই স্কুলেই পড়তে হবে তোজোকে। নন্দিনীর সত্যি মাঝে মাঝে তোজোর জন্য খুব কষ্ট হয়।ওইটুকুনি ছেলে কিন্তু সারাদিন দৌড়ছে। সকালে রাইডিং, স্কুল থেকে ফিরেই প্রতেকটা বিকেল কেটে যায় সাঁতার ক্লাস বা আঁকার ক্লাসে। কলকাতা হাইকোরটের বিখ্যাত রায়বাড়ির ছেলে হওয়ার যোগ্যতা তাকে অরজন করে নিতেই হবে যে। হয়তো বা নন্দিনীর তরফের বংশগরিমার অভাব ঢাকার জন্যই জয়ন্তর এই আপ্রান প্রচেষ্টা। কিন্তু নন্দিনী কোনদিন কিছুতে আপত্তি করে নি। মেনে নিয়েছে। সত্যি তো তার যাদবপুরের কালীবাড়ি লেনের তিন কামড়ার ফ্ল্যাটে, দিদিভাইয়ের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া আধফালি ঘরের মতো করে তো আর তোজোর বেড়ে ওঠার তুলনা করা যায়না।
মা! তোজোর ডাকে সম্বিত ফিরল নন্দিনীর।ওকে টেনে গাড়িতে তুলতে তুলতেই বুঝতে পারল, আজকেও তোজো খেলার মাঠে খুব হুজ্জুতি করেছে।
কোথায় ছিলে? এত দেরী হল যে?
মা, প্লিজ বকবে না বল। আয়্যাম সরি মা- বাট আজকে রাহুল প্রথম আমায় লাথি দেখিয়েছিল
নন্দিনী প্রায় আঁতকিয়ে উঠল।দামী স্কুলে এ কি ভাষা শিখছে তার ছেলে। আজকেও আবার স্কুল থেকে ডেকে না পাঠায়। এই নিয়ে এই মাসে তাহলে তিনবার হবে। জয়ন্তকে এসব বলতেও ভয় করে। তোজোকে সেদিন যেভাবে মারল। কি যে করবে নন্দিনী?
তুমি আজকেও আবার মারামারি করেছ? কতদিন বলেছি না রাহুল তোমায় বাজে কিছু বললে বা মারলে ম্যাম কে বলবে। দেখি তোমার ডায়েরি দেখি
আরে জানো মা আজকে খুব মজা হয়েছে খিলখিল করে হেসে উঠল তোজো, তোমার কোন ভয় নেই। আজকে গারজিয়ান কল হয়িনি।…ম্যাম দেখতেই পায়নি, আমি মেরেই পালিয়ে এসেছি
নন্দিনী ভেবে পাচ্ছিল না কি করবে। ছেলের প্রত্যুতপন্নমতিত্তায় খুশি হলেও তা তার সামনে প্রকাশ করাটা ঠিক হবে না।
আর কখনও এরম করবেনা। মনে থাকবে? তোমায় কেউ কিছু বল্লেই ম্যাম কে বলে দেবে। বুঝলে?
ওকে মাম্মু আদর খেতে খেতে নিজের মায়ের কোলে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিল তোজো।নন্দিনীও হেসে উঠল। ওই ওদের ক্লাসের মিস সান্যালেরও বাড়াবাড়ি। সময় পেলেই মা বাবাদের ডেকে ডেকে কথা শোনাবেন আপনাদের বাড়িতে এরকম কথা বলবেন না। ওরা এসব শেখে ওখান থেকেই। আরে বাবা তোর নাকের ডগায় কচি কচি ছেলেমেয়েরা যা করছে তা সামলাতে পারিস না? সারাদিন খালি মেকাপ আর গল্প।
গাড়িটা গড়িয়াহাট ফ্লাইওভার এর নীচ দিয়ে হিন্দুস্থান পারকের দিকে বাঁক নিতেই নন্দিনীর চোখ আঁটকে গেল। সুখ না? হ্যাঁ সুখলতাই তো। প্রায় ১২ বছর পড়ে দেখলেও নন্দিনীর চিনতে ভুল হয়নি্বে?নেমে কথা বলবে না কি এড়িয়ে যাবে? হলই বা একসময়ের প্রিয় বান্ধবী, যোগাযাগ নেই তাও তো বহুকাল হল। আর সেই ঝামেলাটা? কথা বলতে গেলে সুখলতা যদি অপমান করে?ওর মতো মেয়ের কোন ভরসা নেই।
ভাবতে ভাবতেই পৌছে গেল ওরা। পুরোনো আমলের সাবেকি শ্বশুরবাড়ি তার। আজকাল অবশ্য এই গাড়িবারান্দাওয়ালা বাড়িটাকেই নিজের বাড়ি বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে নন্দিনী। সাউথে এরকম গুটিকয়েক বাড়িই বাকি আছে আর। বাকি সব প্রোমোটারেরা গিলে খেয়েছে।
আজ এত দেরি হল নতুন বউ?
তোজোর স্কুল থেকে বেরতে বেরতেই দেরী হয়ে গেল বপি। তুমি খেয়ে নিয়েছো তো?
এ আবার কোনা ধারার কথা বারতা শুনি? আমি কোনদিন দাদুভাই না এলে খাই?
কেন যে এত অনিয়ম কর। ও জানতে পারলে খুব রাগ করবে।দাঁড়াও আমি তোজোকে হাত মুখ ধুঁইয়ে নিয়ে আসি
বপি তার পিসিশ্বাশুরি। জয়ন্তর মা মারা গেছিলেন অনেক ছোটবয়সে। শ্বশুরমশাই ও গত শীতে মারা যান। এখন এই সাতমহলা বাড়ি এবং রাজ্যপাটের সরবেসরবা বলতে তাই নন্দিনী। এ নিয়ে তার যতয়ি চাঁপা গুমর থাক তা সে কখনও বপির কাছে প্রকাশ করেনা। তাকে যথেষ্ট সম্মান করে জয়ন্ত এবং নন্দিনী দুজনেই। বপি তার একাকিত্বের নিরজন বাসরে একমাত্র সঙ্গিনী। এবং তার কাছে নন্দিনী আজও নতুন বউ। জয়ন্ত তো সারাদিন কাজ নিয়েই ব্যস্ত। লাইব্রারি, চ্যাম্বার সেরে তার ফিরতে ফিরতে কখনও রাত গড়িয়ে যায়। আগে রাতের খাওয়া টুকু একসাথ খেত ওরা। কিন্তু আজকাল তাও হয়না। বাড়ির একপাশেই জয়ন্তর চ্যাম্বার। কিন্তু আজকাল দেখা হওয়াটাও একটা সকালের খবরের কাগজের রূটিন হয়ে গেছে। মাঝরাত্তিরে কখনো কখনও বিছানায় অচেনা একটা শরীর ঠেকলে বুঝতে পারে যে দাম্পত্য টা আজও বেঁচে আছে।নিত্য নতুন শাড়ি গয়নার সুখের মাঝে তার এই নিটোল জীবনে বুঝি ওইটুকুনি বা প্রাপ্তি।
আগে খুব রাগ করত নন্দিনী। কান্নাকাটি করত, ঝগড়া করত। আজকাল আর করেনা। এই তো সেদিন কোন একটা মামলায় জয়ন্তের জয়ের খবর মিডিয়া খুব প্রচার করেছে। সকাল থেকে তার বাপের বাড়ির থেকে কত যে ফোন এসেছে। একটা আলাদা গরব বোধ করেছে সে। মিসেস রায় হিসেবে প্রত্যেকটা পারটিতেও যে আজকাল তার আলাদা কদর হয়, সে সম্বন্ধেও সে ওয়াকিবহাল।
ছেলেকে খাইয়ে দাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে, নন্দিনীও গা এলিয়ে দিল বিছানায়। আজকাল দিবানিদ্রা টা বেশ অভ্যেস হয়ে যাচ্ছে। বাজে অভ্যেস- কাঁটাতে হবে। আসলে বিকেলে ছেলেকে নিয়ে আরেক দফা বেরোনোর আগে বেশ আরাম লাগে একটু ঘুমিয়ে নিতে। তবে এবার সত্যি ছাঁড়তে হবে অভ্যেসটা। সেদিন জয়ন্তো রাত্রে বলছিল যে মোটা হয়ে যাচ্ছ।
না! এসব সাতপাঁচ ভেবেয়ি উঠে পড়ল সে। কিন্তু করেটা কি? গল্পের বই হাতের কাছে একটাও পেল না। ম্যাগাজিন সবগুলো বপির ঘরে। হঠাত মনে পড়ল সুখলতার কথা। কি মনে হল করডলেস টা তুলে ঝুমার নম্বরটা ঘুরিয়ে ফেললো। ঝুমা তার স্কুল-কলেজ জীবনের একান্ত বান্ধবী। কিন্তু ডায়াল করেই ভাবল যে এখন ফোন না করলেই ভাল হত মনে হয়। এই ভর দুপুরবেলা।
হ্যালো– ওপ্রান্তে ভাতঘুম মিস্রিত একটা গড়পড়তা গলার আওয়াজ শোনা গেল।
হ্যালো ঝুমা? আমি নন্দিনী বলছি রে
হ্যা বলুন ম্যাডাম। কি খবর? আমি ছাড়া আর কে হবে? আপ্নার মত শতকোটী দাসীবাঁদী নেই আমার
আবার আরম্ভ হল। এতদিন বাদে কথা হচ্ছে। আর একটা ফোন করলেও তো পারিস। সেই দেখ আমিই করলাম- তা আছিস কেমন?
আমি ঠিকঠাক। মাঝে একদিন আমাদের যাদবপুরের পুরোনো পাড়ায় গেছিলাম। কাকিমার সাথে দেখা হল
হ্যাঁ জানি। মা বলল
মাঝে জয়ন্তদার নাম টাম তো দেখলাম পেপারে খুব, টিভি তেও দেখলাম। এক্কেবারে সেলেব্রিটি গিন্নী হয়ে গেছিস তো রে। খুব সাবধান কিন্তু
এবাবা- কেন রে? হেসে গড়িয়ে পড়ল নন্দিনী। সুখের হাসি। গরবের হাসি।
আরে কত সুন্দরী সুন্দরী মেয়েরা আগুপিছু ঘুর ঘুর করছে সারাদিন…আর পুরূষ মানুষ এই বয়সে পিছলোয় বেশী, বুঝলে?
তাই বুঝি।…সৌণক দা ট্রাই করেছে বুঝি?
সৌণক দার এতো সাহস ই নেই
তুই না ঠিক একি আছিস
তুইও তো একদম বদলাসনি যে- সেই যযেমন ন্যাকা ছিলি ঠিক একি আছিস
যাহ! আমায় ন্যাকা বলবি না একদম- ক্যালাবো কিন্তু
এই তো মামনি লাইনে এসেছো- রায়বাড়ির বৌয়ের মুখে এ কি ভাষা? তউবা তউবা!তোর পিসিশ্বাশুরি শুনলে অক্কা যাবেন- তা তিনি কি অলরেডী পটল তুলেছেন নাকি?
আরে না না- উনি স্বশরীরে আছেন- খাচ্ছেন, দাচ্ছেন, ঘুমচ্ছেন- আমায় বেশী ঘাটান না।।আমিও বেশী জড়াই না। তোর শ্বাশুরি কেমন আছেন?
আর বলিস না। বিছানায় শুয়ে, সেই এক অবস্থা। তবু মুখ যদি শুনিস না
ছাড় তো
নারে নন্দু, তুই সত্যি লাকি- শ্বশুর, শ্বাশুরি ঝামেলা নেই, ওরকম একটা জম্পেশ হাজব্যান্ড পাকড়াও করেছিস। বাড়ি, গাড়ি- আর কি চাই?
আহা! সৌণক দা যে লাস্ট দুবছরে স্টেটস থেকে মুঠো মুঠো ডলার কামিয়ে আনলো সে বেলা কি ঝুমস ডারলিং।
আর ন্যাকামো কোরোনা তো। তোর সৌনক দাদের কোম্পানির কাউন্সেল তো আপনার উনি- তাই আমি খানিকটা হলেও জানি যে সেই টাকা আপনার পতিদেবের এক বার কি বড়োজোর দুবারের এপিয়্যারেন্স ফি
আচ্ছা বাবা, থাম তো নিজের বৈভবের এই প্রকাশে খুশী হলেও পুরোনো বান্ধবীর এহেনপরশ্রীকাতরতা ঠিক ভাল লাগছিল না নন্দিনীর। শোননা, যে জন্য ফোন করেছিলাম। আজকে কার সাথে দেখা জানিস?
কে? অনিন্দ্য?
না। তার বেটার হাফ। যদি অবশ্যই ওরা বিয়েটা করা থাকে
বলিস কিরে? সুখলতা? কথা বললি?
না না। আমি গাড়িতে ছিলাম তো। ও ফুটপাথ থেকে কিচু কিনছিল
চিরকালের ফুটপাথিয়া
আমার ইচ্ছে হচ্ছিল জানিস একবার নেমে কথা বলি।তারপর ভাবলাম থাক
বলতেই পারতি কিন্তু। একটা ধন্যবাদ কিন্তু ওর প্রাপ্য
কিসের ধন্যবাদ, একটা বেহায়া মেয়েমানুষ- নিজের সব থেকে কাছের বান্ধবীর সাথে কেউ এরকম করতে পারে বলে আমার জানা ছিল না
আহা! নন্দু রাগ করছিস কেন। ভাবি না- ও না থাকলে অনিন্দ্যর মতো একটা ফ্লারটের আসল মুখোশ টা কি তুই টের পেতি?
হ্যাঁ রে এবার তুইও ওর সালিশি কর কট করা লাইন টা কেটে দিল নন্দিনী।
রাগে মাথাটা ঝাঁ ঝাঁ করছে। সত্যি এত রাগ জমে আছে এখনও, এতদিন বাদে? তাও আবার কার জন্য? না ওই একটা হেঁদি পেঁচি মেয়ের জন্য যে কিনা হিংসেয় অন্ধ হয়ে নিজের প্রিয় বান্ধবীর পিঠে ছুরি চালাতে দ্বিধা করেনা। নাকি রাগ একটা অতীব জঘন্য অতীতের জন্য যাকে একদিন সে সত্যি সত্যি ভালবাসা ভেবেছিল।
তোজোর আঁকার ক্লাসের বন্ধুদের সাথে নন্দিনীর খুব ভাব। দীপময়ের মা রুনা তো নন্দিনীর সাথে একি স্কুলে পড়তো। পড়াশুনায় নন্দিনীরা রুনার ধারেকাছেও কোন দিন আসতো না। তাই বন্ধুত্ব টাও ক্লাসমেটের পরযায়েই রয়ে গেছিল। আজকাল অবশ্য আঁকার ক্লাসে নিজেদের কচি কাঁচাদের ঢুঁকিয়ে দিয়ে তারাও একটা আসর জমিয়ে বসে কোনো একজনের বাড়িতে। আজকে নন্দিনীর পালা। বিকেলে তোজোকে নিয়ে বেরোনোর আগে তাই রান্নার লোককে বিশেষ ভাবে ফিস ফ্রাই টা ভাজার কথা বুঝিয়ে দিয়ে গেল। গাড়িতে উঠেই মনে পড়ল যে টিস্যু পেপার রকাহতে বলার কথা তো মনেই নেই। কি জানি বুদ্ধি করে রাখবে কিনা। যা এক এক জন কাজের লোক হয়েছে। দুপুরের গনগনে রাগটা এখন অস্তমিত। গাড়িতে যেতে যেতেই মোবাইল থেকে ফোন করে ঝুমার কাছে দুপুরের ঘতনার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে সে।
কিন্তু ঘটনাটার ঈতি সেদিনই হতেয় পারতো। হল না কারণ সেদিনের আসরে রুনা ফস করে সুখলতা আর নন্দিনীর সেই অমোঘ বন্ধুত্বের কথা পারায়।
আচ্ছা নন্দিনী, তোমার সেই প্রিয় বন্ধুটির কি খবর গো?
কে ঝুমা?
আরে না না, ঝুমার সাথে তো আমার প্রায়ই দেখা হয়। ওর বর আর আমার বর একি ক্লাবের মেম্বার যে। আমি বলছি ওই যে লতা না কি জেন নাম ছিল
কে বলোতো? নন্দিনির স্বরে হঠাতই অসম্ভব শৈত্য।
আরে তোমার মনেই নেই- তোমরা তো গলায় গলায় বন্ধু ছিলে। মনে পড়েছে সুখলতা না কি যেন নাম। তোমারা তো একি কলেজেও বরতি হয়েহচিলে তাই না
আমার না ঠিক মনে পড়ছে না জানতো- আসলে এতদিন কার আগেয় কার ব্যাপার- সাম্নে এলেয় হয়ত মনে পড়বে নন্দিনী কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল।
তাও ঠিক। অনেকদিনের ব্যাপার। কিন্তু তাও ভাবলাম তোমরা এত ভাল বন্ধু ছিলে, তাই হয়ত তুমি জানবে।
রাত্রে শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষন এই কথাটাই ভাবল নন্দিনী। বার বারি ফিরে যাচ্ছিল সে তাদের সেই আলুকাবলি-কালোনুনেরর ভাললাগায়। তার আর তার সুখের প্রত্যেক্টা গল্পকথায়। কলেজে থাকতে ফোনে বেশীখন কথা বললে বাবা রাগ করতেন বলে, সুখ একবার রাত্তির ১০ টার সময় তাদের কালীবাড়ি লেনের ফ্ল্যাটে এসেছিল। শুধুমাত্র নন্দিনীর সাথে  থাকবার জন্য। সেদিন কি কারণে যেন নন্দিনীর সাথে অনিন্দ্য খুব ঝগড়া করেছিল। ওই বয়সে যেমন হয়- মনে হয়েছিল সে সত্যি মরে যাবে। সুখ কে বলতেয়ি সে ছুটে এসেছিল। সুখের দাদা পৌছে দিতে এসে বলেছিল- তোরা আগের জন্মে বোন ছিলি মনে হয় জানিস
ভাবতে ভাবতেই এক চিলতে হাসি খেলে গেল নন্দিনীর ঠোঁটের কোনে। সুখসস্ম্রীতি ই বলা চলে কি এগুলোকে? না কি তার দুঃস্বপ্নটা সত্যি হওয়ার প্রাদুরভাব? সেদিন নাকি অনিন্দ্য ই ফোন করে সুখলতা কে নন্দিনীর পাশে থাকতে বলেছিল। তখন থেকেই কি ওরা নন্দিনীর পেছনে পেছনে এই ষড়জন্ত্রটা করছিল?
কেমন যেন স্বপ্ন মনে হয়না সব? সুখ কে অনিন্দ্যর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নন্দিনী ঠিক করেছিল যে অনিন্দ্যর বন্ধু ভাস্বরের সাথি সুখের ব্যাপারটা এগোনো যায় নাকি দেখা যাক। একসাথে বইমেলা যাবার প্ল্যান করতে গিয়েই তো সামনে আসে ব্যাপারটা।
ঝুমা ঠিকই বলেছিল। সুখলতার নন্দিনীর কাছ থেকে সত্যি একওটা বড় ধন্যবাদ প্রাপ্য। ও না থাকলে হয়ত বা ওই বাউন্ডুলে অনিন্দ্যর সাথেই ঘর বাঁধতো। কোথায় থাকতো এতো বৈভব, এত আরাম, এত বিলাসিতা। জয়ন্তর মতো ভাল জীবনসঙ্গীও খুঁজে পেত না সে। মনে আছে তখন সবে সম্পরকটার পাট চুকিয়েছে সে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের লাইব্রারী তে অনারসের একটা বইয়ের খোজে গেছিল নন্দিনী। ওখানেই একটা ওপেন ক্যুইজ প্রতিযোগীতার ক্যুইজমাস্টার ছিল ব্যরিষ্টার শশীনাথ রায়ের একমাত্র ছেলে সদ্য বিলেত ফেরত ব্যরিষ্টার জয়ন্ত রায়। স্কুল কলেজের অভ্যাস বশঃতই ঝুমাকে সঙ্গে নিয়ে সেই প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহন করে সে। এবং বলা বাহুল্য সেদিন জিতের পাল্লাটা নন্দিনীর দিকেয়ি ভারি ছিল। জয়ন্তর বাবার একটু আপত্তি ছিল, কিন্তু তা ধোপে টেকেনি। ১ বছরের মধ্যে রায় বাড়ির বৌ হয়েছিল সে। এর জন্য অনিন্দ্য এবং সুখলতার একটা ধন্যবাদ তো পাওনা বটেই।
                                                       ৪
সকালবেলা ঠিক ৯।৩০ টায় কোরটে বেরোয় জয়ন্ত। তার আগের সময়টা মল্লযুদ্ধ চলে রায় বাড়ির অন্দরমহলে। সকালবেলা এখনো তোজোকে একা স্কুলে ছাড়ে না নন্দিনী। ৭।০০ টায় তাকে স্কুলে পৌছে দিয়ে এসেই জয়ন্তর স্নান, খাওয়া সবকিছুর তত্ত্ববাধানে থাকতে হয় তাকে। এই সময়টায় জয়ন্তর ভারি দরকার নন্দিনীকে। এমনকি জয়ন্তর সমস্ত মামলার দরকারি কাগজপত্র জুনিয়র রা এবং ক্লারক রা ঠিকমত গারিতে তুলল কিনা, তাও একবার চটজলদি দেখে নেয় নন্দিনী। এই ব্যাপারে জয়ন্ত অনেকটাই নিরভর করে তার ওপর। আজকেও ব্যতিক্রম হল না।
জয়ন্ত বেড়িয়ে যেতেই টেলিফোনের বোতাম টিপল নন্দিনী।
হ্যালো, ও প্রান্তে মা র গলার আওয়াজ।
মা, আমি বলছি, কেমন আছো?
তুতান- কালকে সারাদিন ফোন করিস নি কেন?
এমনি, একটু ব্যস্ত ছিলাম মা। বাবা কেমন আছে? নতুন ওষুধটা কাজ করছে?
আর বলিস না, ওটা খেয়ে যেই একটু ব্যথা কমেছে, ওমনি আবার বলে বাজারে যাবো।
হুমম, আর দিদিভাইদের কি খবর?
তুই ফোন করে খবর নিস না কেণ? বাপ্পাটার নাকি জ্বর হয়েছে
নেব মা, পরশুই কথা হল…আজকে নয় করব আবার
আজকে বিকেলে আয়না, এখান থেকে এখানে। তোর তো গাড়িও আছে
আজকে হবে না মা। একটু কাজ আছে
আজকে আবার কি একটা দিন তো ছেলেটাকে একটু রেহাই দে। সেই ভোর পাঁচটায় ওঠে ওয় দুধের শিশুটা
ময়দানে গিয়ে দেখো কোনদিন, ওর বয়সী অনেকেই আছে
যাই বলিস তোদের বাড়াবাড়ি। তা জয়ন্ত অফিস বেরিয়ে গেছে?
হ্যাঁ– নিয়মমাফিক কথোপকথনের ময়াঝখানে কি ভাবে কথাটা পারবে তা ভেবে পাচ্ছিল না নন্দিনী।
মা শোনো- একটা কাজ করে দেবে?
কি রে
আমার পুরোনো ফোনবুকগুলো এখন আছে আমার আলমারিতে। একটু দেখে বলতো সুখলতাদের বাড়ির নাম্বারটা
কি কুরবি তুই? আর ঝগড়া করে লাভটাiই বা কি? কবেকার কি ঘটনা
আহ! দাওইনা
না দেব না- আমি কি জানিনা তোদের মধ্যে কি গন্ডগোল্টাই না হয়েছিল- সব কবে চুকে বুকে গেছে, সুখে ঘর সংসার করছিস, এবার কিসের দরকার শুনি?
আচ্ছা ঠিক আছে, আমি রাখছি এখন
যা ভেবেছিল তাই। মা ফোন নাম্বারটা দিতে রাজি হল না। অবশ্য সেই নাম্বার এখনও কারযকরী আছে নাকি সেটাও ভগবানই জানেন। আরেকটা ঊপায় ও হতে পারে- সুখলতাদের বাড়ি যাওয়া। এটা করতে চায়না বলেই ফোনের আড়াল নেওয়া। কারণ ওদের বাড়ি যাওয়া মানেই কাকিমা, দাদা, কাকুর মুখোমুখি হওয়া। এখনও মনে আছে, সেবার যখন সুখলতাকে বাড়ি বয়ে দু কথা শুনিয়ে এসেছিল নন্দিনী, বার বার কাকিমা বলেছিল- ওরে তুতান শোন- কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। তোরা দুজন বোনের মতন-বন্ধুত্বটা ভাঙ্গিস নারে। অবশ্য ওদের ঠিকানা যদি না বদলেয় গিয়ে থাকে। না থাকলেও তারা কি নন্দিনী কে সুখলতার ঠিকানা বলবে?
স্নান সেরে নিয়ে তাড়াতাড়ি শাড়িটা বদলে নিল নন্দিনী। শাড়ির প্লিট ঠিক করতে করতেই কি কি করতে হবে ঠিক করে নিল সে। গাড়িটা নেওয়া চলবে না। তার এজন্মের সাথে সুখলতাকে সে জড়াতে চায়না। বপি কেও বলে যেতে হবে।  কি বলবে ঠিক করতে করতেই মনে হল যে তোজোকেও তো আনতে যেতে হবে। কি আর করা- একদিন ড্রাইভারের ভরসাতেই ছাড়তে হবে। মন সায় না দিলেও আর কোন উপায় নেই।
একতলায় নেমে এসে বপির ঘরের দিকে যেতে যেতে সে আরেকবার ভাবল-যা করছে ঠিক করছে কি না। জয়ন্ত জানতে পারলে যে কি ভাববে কি জানে। এরকম ভাবে পুরোনো ঘা কে খুঁচিয়ে তোলার কোন কারণ থাকতে পারে না। কেন যাচ্ছে সে? তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার পর তার একদা দুই সব থেকে প্রিয় মানুষ ভাল আছে নাকি খারাপ আচে সেটা দেখার জন্য? না কি ধন্যবাদ টা শুধুই বাহানা। সে অনিন্দ্যকে দেখাতে চায় যে দেখ আমি কত ভাল আছি, তুমি এর সিকিভাগ সুখও কোনওদিন দিতে পারতে না আমায়।
বপি, আমার এক বন্ধুর বরের খুব শরীরখারাপ করেছে। হসপিটালে আছে। আমি সেখানেই যাচ্ছি। গাড়িটা নিচ্ছি না। তোজোকে আন্তে হবে তো। আমি ড্রাইভার কে বলে দিয়েছি। ও নিয়ে আসবে তোজোকে
সে কি, ড্রাইভার আনবে মানে? আর তুমি গাড়িটা নিয়ে যাও নয়, তোমাকে নামিয়ে দিয়ে নয় দাদুভাইকে আনতে যাবে
না না ঠিক আছে। সে অনেক সময় লাগবে। সেই নরথে, আমি চলে যাব ঠিক, চিন্তা কোরোনা
কার বর গো ঝুমা?
না না ঝুমা না। তুমি চিনবে না। মাসিকে বলা আছে তোজো এলে তোমাদের কেহেত্য দিয়ে দেবে। খেয়ে নিয়ো। আমার ফিরতেয় সন্ধ্যে হয়ে জেতে পারে। আসি আমি
উত্তরের অপেক্ষা না করেই রাস্তায় বেরিয়ে এলো নন্দিনী। হিন্দুস্থান পারক পেরিয়ে গরিয়াহাট মোড়ের দিকে হাঁটতে হাঁটতে নন্দিনীর হাসি পাচ্ছিল। কলেজে পড়তে কতদিন সুখ, ও আর ঝুমা গড়িয়াহাট পায়ে হেঁটে চষে বেরিয়েছে। অনিন্দ্যর সাথেও কতবার এসেছে। তখন এই ভিড় ভাট্টার মধ্যেই তৈরী হয়ে গেছে কত সুন্দর উষ্ণ মুহুরত। আর আজ তার রাস্তা পের হতেই ভয় লাগছে।
রামগড়্গামী মিনিবাসটায় উঠে আরও একবার ভাবল নন্দিনী। কাজটা ঠিক হচ্ছে না বোধহয়। সে কি এখনও অনিন্দ্যকে ভালবাসে? না, মোটেও না। জয়ন্ত কে জীবনে পাওয়ার পর একদিনও সে অনইন্দ্যর কথা ভাবেনি। সুখলতা কে খুব মিস করেছে কয়েকটা মুহুরতে, কিন্তু পরখনেই যখন অর তীব্র বিশ্বাসঘাতকতার কথা মনে পরেছে তখনি ঘেন্নায় গুতিতে নিয়েছে নিজেকে।
রামগড় বাসস্ট্যান্ডে যখন নামল তখন বাজে প্রায় বেলা ১২টা। ঘেমে নেয়ে একসার অবস্থা। ভর দুপুর বেলা এভাবে কারও বাড়ি যেতেও বা কেমন লাগে। কি মনে করে মোড়ের মিষ্টির দোকানটা থেকে ৩০ টাকার কালাকাঁদ কিনল নন্দিনী। কাকু খুব খেতে ভালবাসত।
সুখলতাদের বাড়ির গলিতে ঢুকতেই হকচকিয়ে গেল নন্দিনী। কতদিন আসে না এইদিকটায়। পুরোনো বাড়িগুলো প্রায় নেই। সুখলতাদের টাই বা আছে কিনা কে জানে। কিছুই চিনতে পারছিল না সে। এখন কি করে। একটা আঁকার স্কুল ছিল ওদের বাড়ির সামনে। সেটা আচে কিনা কে জানে।
এবং আশ্চরয, স্কুল টা আছে। সুখলতাদের বাড়িটাও আছে। একি রকম। অবিকল। কোন রদবদল হয়নি। তাদের জীবনের উন্মত্ত একুশ বছর বয়স যেন আটকে আছে তার চোখের সামনে। এখানেই শেষবার সে দেখেছিল অনিন্দ্যকে।
কলিং বেল টা বাজিয়ে খানিক ইতস্তত করল নন্দিনী। ঝোকের মাথায় এসে তো পড়েছে কিন্তু কি বলবে, কি করবে তা কিছুই ভাবেনি। ধন্যবাদটাও তো একটু কায়দা করে বলবে নাকি। যদি খুব ঝগড়া হয় তখন কি করবে? ইসস! ঝুমাটাকে সাথে নিয়ে এলেই হত। একবার একটা ফোন করে নেবে নাকি।
ভাবনাটাই সার। কারণ তখন নন্দিনীর সামনে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে সুখলতা। চোখেমুখে বিস্ময়ের লেশমাত্র নেই। যেন জানাই ছিল নন্দিনী আসবে।
তুই? কি মনে করে?
মানে।… খানিকটা হলেও হতভম্ব হয়ে পড়ে নন্দিনী। অনেক হিসেব কষেও এই সময় সুখলতার এই বাড়িতে এই সময় উপস্থিতির কারণ খুজে পাচ্ছিল না সে। সেদিন দূর থেকে না দেখলেও আজকে বুঝতে পারল যে সুখলতার হাতে কানে বা গলায় এঁয়োতির কোন চিহ্নমাত্র নেই। তবে কি অনিন্দ্যর কিছু হল? বুকটা ছ্যাত করে উঠল।
না মানে, ওই সেদিন তোকে গড়িয়াহাটে দেখলাম। তাই মনে হল যে একটু দেখা করে যাই
বাহ! এতদিনে মনে পড়ল তাহলে। আমি তো ভেবেছিলাম পটেরবিবির আজকাল পতিগরবে মাটিতে পাই পড়ে না
কথাগুল শ্লেষের মত করে ফুটল নন্দিনীর কানে। জমা রাগ টাও যেন ফিরে এল।
একশোবার। জবরদখলি ত নয়। নিজের পতিদেব। এটুকুনি ক্রেডিট তো নিতেয়ি পারি
সেই। কিন্তু আজ যখন এসেই পড়েছিস, তখন ভেতরে আসবি তো নাকি?
ভিতরে ঢুকে খানিকটা চমকে গেল নন্দিনী। এক যুগে একটুও পালট্টায়নি ওদের অন্দরমহল টা। সব কিছু ঠিক একরকম। শুধু দেওয়ালে কাকুর একটা ছবি যোগ হয়েছে। বহুদিনের বাসি ফুলের একটা মালাও ঝুলছে ছবিটায়। এখন মনে পড়ল ঝুমা বলেছিল বটে যে সুখের বাবা মারা গেছেন। তাও তো প্রায় ৫ বছর আগের কথা। ইস! কালাকাঁদ টা না আনলেই ভাল হত। তাকে বসিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে কি যেন খুটখাট করেই চলেছে সুখলতা। মিষ্টির প্যাকেটটা কি সরিয়ে ফেলবে এর মধ্যে। ভেবেই ভাবল না থাক। আবার কি ভাববে।
হাতে একটা সরবতের গ্লাস নিয়ে বেরিয়ে এল সুখলতা।
এই নে, তোর সেই আমপোড়ার সরবত
না থাক
থাকবে কেন? রোদ থেকে এলি- কি অবস্থা হয়েছে মুখের। মার মতো বানাতে না পারি, কিন্তু আমিও মন্দ বানাই না
কাকিমা কোথায়?
এই তো আসার সময় মোড়ের মাথায় একটা নতুন ফ্ল্যাট হয়েছে দেখলি না? আরে যেখানে ওই ওষুধের দোকানটা ছিল। সেখানেই দাদারা ফ্ল্যাট নিয়েছে নতুন। দাদা বৌদি দুজনেই বেরিয়ে যায়। বাচ্চাটা ফিরলে মা গিয়ে একটু থাকে, দেখাশুনা করে
বিতান দার কি ছেলে না মেয়ে?
ছেলে। বৌদিকে তো চিনিসই
অ! ওকেই বিয়ে করেছে?
মানে? আর কাকে করবে?
না না। মানে ওই আর কি
তুই কেমন আছিস বল? কি করছিস আজকাল?
আছি মন্দ নয়। মুরলীধর কলেজে পড়াচ্ছি। সেদিনকে মনে হয় ওখান থেকে ফেরার পথেই কিছু টুকটাক কেনাকাটি সারছিলাম। তখনি দেখেছিস
মুরলীধর কলেজ? সে তো এক্কেবারে আমার বাড়ির সামনে। একদিন চিনে চলে আসিস নি কেন?
জানি।অনেকবার ভেবেছি রে। তারপর মনে হয়ছে যদি আবার অপমান করে তাড়িয়ে দিস- এই সরবত টা খা, ভয় নেই বিষ মিশিয়ে দিয়িনি। আর সেরম হলেয় তোর বর ছাড়বা নাকি আমাকে?
কি যে বলিস না বলেই গ্লাসে এক চুমুক দিল নন্দিনী। অবাক হয়ে যাচ্ছিল যে সুখলতা একবারও অনিন্দ্যর কথা কিছুই বলছে না। অনিন্দ্য কেমন আছে রে? সেও কি এখানেই থাকে?
সুখলতার মুখটা যেন নিমেষে সাদা হয়ে গেল। বলল, তুই কি কিছুই জানিস না নাকি জেনেও না জানার ঢং করছিস?
মুখ সামলে কথা বলবি, কে ঢং করতে পারে আর কে পারে না সেটা সবাই জানে- এতো রেগে যাচ্ছিসই বা কেণ? তোদের তো বাঁধভঙ্গা প্রেম- অনিন্দ্য তো তাই বলেছিল- মনে নেই তোর?
অনিন্দ্য আর আমার ডিভোরস হয়ে গেছে নন্দু- অনেকদিন হল। প্রায় ৫ বছর
মনে মনে যেন খুশির একটা ঝলক খেলে গেল নন্দিনীর।
বাহ! বেশ ব্যাপার তো। হঠাত প্রেমে ভাঁটা পড়ল কেন?
ছিহ! নন্দিনী তুই একরকম রয়ে গেছিস। একরকমের হিংসুটে
আগুনে যেন ঘি পড়ল। অনেকক্ষন চুপ করেছিল নন্দিনী এবার জেন সমস্ত ক্ষোভ উগড়ে দিল- কি? আমি হিংসুটে? লজ্জা করল না তোর এই কথাটা বলতে। তোর মত নিরলজ্জ, বেহায়া মেয়ের থেকে অবশ্য এটাই আশা করা যায়। হিংসেয় তুই জ্বলে পুড়ে মরেছিস চিরটা কাল। কি ছিল তোর- সবসময় তোর থেকে ভাল রেজাল্ট করেছি আমি, দেখতে তুই রূপের ধুচুনি- সেই জন্যই বোধহয় নিজেকে প্রমান করতে ওই বাউন্ডুলেটার সাথে ফষ্টিনষ্টি করতি। সবকিছুতেই তোর কম্পিটিশন
অনিন্দ্যর কথা তোর বর জানে?
কেন? না জানলে তুই গিয়ে লাগাবি নাকি? আমার কোন সুখ টা তুই সহ্য করতে পেরেছিস শুনি
না, আমি শুধু ভাবছি যখন পেজ থ্রিতে তোদের ছবি দেখি তকে কততা স্মারট মনে হয়। আর তর বর তোর এই মূরতি দেখলে মেলাতে পারত তো?
আমার বরের কথা এত দরদ দিয়ে তোর না ভাবলেও চলবে- আমার মনে হয় কি জানিস, তোর সাথে ঠিকই হয়েছে। পাপের শাস্তি মানুষকে এই জীবনেই পেতে হয়তো, ইউ ডিজারভড এভরি বিট অব ইট রাগে হিসহিসিয়ে উঠল নন্দিনী।
তুই বিশ্বাস কর নন্দিনী আমি আজও তাই বলব- সেদিন যা বলেছিলাম। আমি ওরকম কোনোদিন ও করতে চাইনি
একদম বাজে কথা বলবি না। তুই কচি খুকি ছিলি নারে? একজন তোকে এসে ছেলেভুলোনো কথা বলল আর তুই গলে গেলি?
না রে নন্দু। আমি জানি আমি ভুল করছিলাম। সেইজন্য তুই অত কিছু বলার পড়েও আমি কোনোদিনও কিচ্ছু বলিনি
তাই? কোন মুখে বলতি? কি বলতি শুনি। আমি আমার সব থেকে প্রিয় বান্ধবীর প্রেমিকের সাথে প্রেম করি?
নন্দিনী প্লিজ, অনেকদিন তো হল- আর আমি তো কম শাস্তি পাইনি, তাহলে আজকে আবার কেন? তুই কি এই জন্যেই এসেছিস?
আমি কেন এসেছি জানিস- তোকে ধন্যবাদ বলার জন্য, তুই না থাকলে অনিন্দ্যর আসল মুখোশটা কোনদিনো জানতে পারতাম না
হঠাত? এতদিন বাদে?
এমনি- ধরে নে কালকে তোকে দেখার পর খেয়াল হল
তাহলে দেখেছিস তো আমি সত্যি তোর কত ভাল বন্ধু
তাই বুঝি? গরল পান করে সাধ্বী হলি নাকিরে?
শোন তোর যত খুশী ঝগরা করিস, আমার খুব খিদে পেয়েছে। মা খাব্র ধাঢাকা দিয়ে গেছে। স্কুল থেকে এসে কিচ্ছু খাইনি। খেয়ে নিতেয় দেয়ে
৬০০ স্কোয়্যারফুটের এই ফ্ল্যাট টার ড্রয়িং কাম ডাইনিং রুমে বসেছিল নন্দিনী। নিজেরও খুব খিদে পেয়েছে তার। সুখলতা খাব্র বাড়ছে। আগে কলেজ থেকে ফিরে দুই বন্ধুতে এক্সসাথে অনেকদিন এই টেবিলেই খেয়েছে। কিন্তু আজ আর তা সম্ভব নয়।
এই নন্দু, মা কচুবাঁটা করেছে- খাবি?
এক নিমেষে নন্দিনীর বয়সটা ১২ বছর কমে গেল।
কাকিমার হাতের কচু বাঁটা? কেন খাব না? তোর কম পড়ে যাবে না তো?
না আমি ভাবলাম তুই এখন খাস কিনা কে জানে। আর আগে কোনোদিন কম পড়েছে যে আজকে পড়বে?
আর বলিস নারে, আমার শ্বশুরবাড়ি ঘটি- তাহলেই ভাব!
এ বাবা- এ কি করেছিস রে? আচ্ছা, তুই বস আমি একমুঠো চালের ভাত বসিয়ে দিয়ে আসি। কি অবস্থা দেখ, তুইও এই ভর দুপুরবেলা এলি, আমার মনেও নেই খাবি কিনা জিজ্ঞেস করতে
শোন না। আজ বরং থাক এসব ঝামেলা। আমি খেয়েই এসেছি। আরেকদিন হবে নয়
তুই আর কোনদিন আসবি নন্দু?
খেতে বসে খানিকটা আরষ্ট হয়েই ছিল নন্দিনী। কি ভেবে এসেছিল আর কি করছে। তোজো স্কুল থেকে বাড়ি ফিরল নাকি কে জানে। একবার ফোন করবে কি না ভাবছিল। নীরবতাটা ভঙ্গ করল সুখলতা।
কিরে খাচ্ছিস না কেন? কিছু ভাবছিস?
নারে ছেলেটা স্কুল থেকে ফিরল কিনা কে জানে?
ওহ! এই ব্যাপার? ফোন করে নে না একটা!
নারে ঠিক আছে। কিছু হলে আমার পিসিশ্বাশুরি ফোন করতেন নিশ্চয়
হাল্কা একটা হাসি খেলেয় গেল সুখলতার মুখে। নন্দিনীর চোখ এড়াল না হাসিটা।
হাসছিস যে বড়?
নারে, বেশ আছিস তুই- বাচ্চা কাচ্চা, স্বামী-সংসার।…
একটা কথা জিজ্ঞেস না করে পারছি না রে সুখ, তোদের ছাড়াছাড়ি তা কেন হল রে?
শুনবি? আবার আমাকে দোষারোপ করবি না তো?
না বল
আমি ওর কাছে মা হওয়ার দাবি রেখেছিলাম রে নন্দু। বদলে ও আমায় কি বলেছিল জানিস?
কি?
ও এখনও তোকে ভালবাসে। তখন ঝোকের মাথায় নাকি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। পরে নাকি বুঝতে পারে যে আসলে ও তোকেই ভালবাসে
নন্দিনী কি বলবে, কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। এটাও কি সুখলতার ওপ্র ওর নৈতিক জয়? এরকম টাই তো ও চাইতো অনেক অনেক দিন আগে। তাহলে আজ? আজকে কেন নিজেকে দোষী মনে হচ্ছে? চুরি তো সুখ করেছিল, তাহলে আজকে অস্বস্তিটা তার কান হচ্ছে?
তুই তার পরও? মানে আজকে?
কি করব? তোকে তারিয়ে দিতাম, নাকি তোর বাড়ি বয়ে গিয়ে ঝগড়া করতাম যে কেন এরকম  হল?
না মানে তাও
আজব তুই সত্যি। এতে তোর কি দোষ বলত? জয়ন্তদার সাথে তোর সুখের সংসারে আমি কেনই বা জেচে আগুন ধরাতে যাব? একটা মেরুদন্ডহীন পুরূষ মানুষ যদি জীবনের সবথেকে দরকারি সিদ্ধান্তটা না নিতে পারে তার জন্য আমি তোকে কেন দোষারোপ করতাম বলত?
অনিন্দ্য এখন কোথায়?
দেশের বাড়িতে। ওখানকার বাচ্চা ছেলেমেয়েদের পড়ায়
তোরা তো বিয়েটা না ভাঙ্গলেও পারতিস রে- মানে ওর কখন কি মনে হয়
সেই, ওর কখন কি মনে হয় বা ওদের কখন কি বা মনে হয় ভেবেই তো আমাদের সব সময় চলতে হয় তাই না? অনিন্দ্যর যখন ইচ্ছে হল ও আমায় স্বপ্নটা দেখাল, আর আমিও কেরকম বোকার মত দেখে ফেললাম- আবার যখন ইচ্ছে হল নিজের হাতেই স্বপ্নটাকে ভেঙ্গে ফেলল। জানিস ও আবার আরেকদিন ফোন করেছিল, বলে যে ও বুঝতে পেরেছে তোকে পাওয়া আর সম্ভব নয়, আমরা কি আবার নতুন করে শুরু করতে পারি না?
তুই ফিরিয়ে দিলি ওকে?
আমি চিরটাকাল বিশ্বাস করেছি নন্দু যে একটা ভালবাসা হীন সম্পরক কে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। গেলেও সেটার কঙ্কালটা থাকে- সম্পরকটা নয়
কিন্তু ও তো ভুলটা বুঝতে পেরেছিল, ওকে কি আরেকটা সুযোগ দেওয়া যেত না?
হয়তো বা- কিন্তু আমি। আমি যে আর ওকে ভালবাসতাম না নন্দু। সম্মান করতে পারতাম না সম্পরক টাকে আর
সবাই যদি তোর মত হতেয় পারত রে সুখ। এই তোর জয়ন্ত দার কথাই ধর না। প্রচন্ড ব্যস্ত উনি। আমাকে একদম সময় দিতে পারেন না। তবে কি জানিস আমি তোর মতো করে কখনই বেরিয়ে আসতে পারব না। আমার কাছে ভালবাশা মানেই হল একটা বন্ধন রে
হয়তো বা সেটাও ঠিক, কি জানি রে
খেয়ে উঠে হাত ধুতে ধুতে নন্দিনী বলল, এবার আমায় যেতে হবে রে সুখ, তোজো স্কুল থেকে এসে আমাকে না দেখে নিশ্চয়ই খুব দুষ্টুমি করছে
মার সাথেও দেখা করবি না?
আরেকদিন নিশ্চয়ই আসব। সেদিন তোজোকে নিয়ে আসব রে। তুই তো কোনোদিন দেখিস ও নি ওকে
একটা কথা বলব? রাগ করবি নাতো নন্দু? তুই আর আসিস না কখনো রে
মানে? আজকের পরও?
হ্যাঁ রে। আমি সবসময় চাইতাম আমাদের এই ভুল বোঝাবুঝি টা মিটে যাক। কিন্তু আজকে বুঝলাম যে আমাদের মাঝখানের দেওয়াল টা এত বড় হয়ে গেছে এতগুলো বছরে যে একে টপকানো আর আমাদের সাধ্যি নয়
এরকম কেন বলছিস বলতো?
এই দেখনা তুই এরপর আবার ফিরে যাবি তোর দুনিয়ায়। আবার তোকে ঝুমা কি বলবে না বলবে তুই ভুল বুঝবি…আমাকে আর কখনও সেই ভাবে বিশ্বাস করতে পারবি কি তুই? বুঁনিয়াদ টাই যে ঠনকো হয়ে গেছে। একদিন তুই চেয়েছিলি বলে আমরা বন্ধুত্বটা ভেঙ্গে ছিলাম। আজ নয় আমি চাইছি বলে এরকম হোক
সুখলতার বাড়ির গেটটা পেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডে আসার সময় অঝোরে চোখের জল পরছিল নন্দিনীর। গোলপারক পেরোতেই মন খারাপটা একটা ধোঁয়ামেশানো ভাললাগায় পরিনত হল। তার প্রিয় বান্ধবী তো তার জন্য এতকিছু করেছে। সে বিনিময়ে এই টুকুনি পারবে না? কম্পিটিশ্ন তো সবে শুরু।

হিসেব নিকেশ

‘Hisheb Nikesh’ is one of the very first stories that yours truly took the pains of typing down in Bangla Fonts. The story was written quite a few days back, a life time now as it seems. Please excuse the spelling errors and typos which occured due to my inability to use the software properly.

“৯ বছর সময়টা একটু বেশীই লম্বা নয় কি?”- প্রশ্নটা আকাশের দিকে ছুড়ে দিয়েই ফুচকা টা মুখে পুড়ল পারিজাত।
মোহর কুঞ্জের ঠিক বাইরে পসরা সাজিয়ে বসা এই ফুচকাওলাকে খুব পছন্দ পারিজাতের। আগে মাঝে মাঝেই আসত। তখন, যখন ও আর সঞ্জয় চুটিয়ে প্রেম করত। এখন অবশ্য আসা হয়না বিশেষ, প্রয়োজনও পড়ে না খুব একটা। সম্পর্কটা চুকে বুকে গেছে তাও প্রায় এক বছর হতে চলল।
ফুচকার দামটা কে দেবে তা নিয়ে যথারীতি একটা খুনসুটি বাধল। “কি ভাবছ মাস্টারমশাই, ফুচকা খাইয়েই রেহাই পেয়ে যাবে?” – হেসে উঠল পারিজাত।
সেই হাসি যা তখন থেকে অস্বস্তিতে ফেলছে আকাশকে। খুব সুন্দর বলা যায় কি ওই হাসিটাকে? স্বদেশীনি-বিদেশীনি মিলিয়ে কম বর্ণময় হাসি দেখেনি সে। তবুও এই হাসিটা যেন আলাদা। ৯ বছর আগের সেই বাচ্চা মেয়েটাও কি ঠিক একইরকম ভাবে হাসত? এরকমই অস্বস্তি হত কি তার?
“এবার কোথায় যাবেন?” দামটা মিটিয়ে ব্যাগ বন্ধ করতে করতে প্রশ্ন করল পারিজাত।
“তুমি আমাকে এই আপনি আঞ্জে করা বন্ধ করবে?” অভিমানের সুরে বলে উঠল আকাশ।
“তাহলে কি বলব মাস্টারমশাই?”- খিলখিলিয়ে উঠল পারিজাত। আবার সেই হাসি। হাসিটার মধ্যে কি অনেক অভিমান লুকিয়ে আছে? নাকি আকাশকে ব্যঙ্গ করছে হাসিটা?
“যা বলে ডাকতে- রনি দা।”
“যাঃ! আমি তো আপনাকে আগেও মাস্টারমশাই বলেই ডাকতাম। ইংরেজিতে ডাকতাম অবশ্য- স্যার বলতাম।” পারিজাতের হাসিতে এবার একটু দুষ্টুমির ঝিলিক।
“তার অনেক আগে থেকেই তো আমাকে চিনতে- তখন তো রনি দা বলেই ডাকতে।”
“হুম। তা বটে, তবে তা তো ঐরকম ই চিনতাম- আমার পড়শি হিসেবে। যবে থেকে চিনলাম স্যার বলেই ডাকতাম-তাই না?”
“তাই? কবে থেকে চিনলে?”
“আগে বলো তুমি আমাকে কবে থেকে চিনলে?”
“প্রশ্নটা যদিও আমি প্রথমে করেছি-তবুও উত্তর টা আমিই দিচ্ছি – তোমাকে চিনতাম মজুমদার কাকুর মেয়ে হিসেবে। একটা বাচ্চা মেয়ে যে পাড়ায় পূজোর সময় মাইকে কে আগে শারদ শুভেচ্ছা জানাবে তা নিয়ে ছেলেদের সঙ্গে ঝগড়া করত।”
“বাহ! তুমিও তো ঝগড়া করতে আমাদের সাথে, অত বড় হয়েও।”
“হ্যাঁ, তোমাকে তো দেখতামই পুজোর সময়। আরেকবার অবশ্য দেখেছিলাম- আমার বোনের সাথে আঁকার ক্লাসে।”
“হ্যাঁ, কারণ বাকি সময় টা তুমি পড়ার বইয়ে মুখগুজে বসে থাকতে।”
“মোটেও না, কিন্তু এবার তোমার পালা।”
“তোমাকে চিনি…” পারিজাতের চোখের কোনে স্মৃতি রোমন্থনের আবেগ-“সেই বিশ্বকর্মা পুজোর দিন থেকে”
“ওহ! আমার সেই ঘুড়িওড়ানো”-এবার সত্যিই প্রাণখুলে হেসে ফেলল আকাশ। খুব কাছের কোনো জিনিসকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ ছিল হাসিটায়।“জানো আমেরিকায় এই একটা জিনিস খুব মিস করি- ওখানে আকাশ আছে- বসন্তের, হেমন্তের, শীতের- কিন্তু বিশ্বকর্মা পুজোও নেই, ঘুড়িও নেই।”হাসল পারিজাত। সেই হাসি। আবারও।

“জানো রনি দা, ১৭ ই সেপ্টেম্বর দিনটা প্রত্যেক বছর ঘুড়ে ঘুড়ে আসে- কিন্তু সেই সময়টা একবারই এসেছিল- কি যেন বলে সাহিত্যে- সহস্র বছর পেরিয়ে- একবারই।”
“তুমি এরকম রহস্য করে কথা বলা কবে থেকে শিখলে বলো তো? যাদবপুরে ঢুকে নাকি? নাকি এখন অফিসে বসের সাথে বুদ্ধিযুদ্ধ খেলে?” – আকাশ অনেক কৌতূহল মিশিয়ে প্রশ্নটা করেই ফেলল।
“ধ্যাত!”
“না সত্যি, ছোটবেলায় যখন তোমায় পড়াতাম তখন তো এরকম ছিলে না”
“এক্সকিউজ মি- তখন আমি মাধ্যমিক দিচ্ছিলাম-মোটেও বাচ্চা ছিলাম না” পারিজাতের গলায় কপট রাগ।

এবার বেশ মজা হচ্ছিল আকাশের। বাচ্চা মেয়েটা সত্যি বেশ অনেক বড় হয়ে গেছে। একজন আদ্যন্ত রোম্যান্টিক গোছের। সময়টাও তো কম নয়। এই সেদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, আড্ডা, ইঞ্জিনিয়ারিং এর পড়াশুনার থেকে ঝিল পাড়ে বেশী সময় কাটানো আকাশও কি আজ নিউ ইয়র্ক নিবাসী আকাশ দত্তর বড্ড অচেনা নয়?
মোহর কুঞ্জের সংলগ্ন রাস্তাটা ধরে ভিক্টোরিয়ার দিকে হাঁটছিল ওরা। শীতের বিকেলে হাল্কা হিমের পরশটা বেশ ভালই লাগছিল। ওদের মাঝখানের প্রায় ১৫ মিনিট ধরে চলা নীরব মাপঝোক টাও বেশ উপভোগ্য। দুজনেই জানে দুজনের মনেয় চলছে অনেক হিসেব নিকেশ- একে অপরকে নিয়ে, কিন্তু যোগ বিয়োগের ফলাফলটা কেউ জানে না।
“তুমি এখানে কেন আসতে চাইলে বল তো?” নীরবতাটা ভাঙল পারিজাতই।
“কেন? মানে ভিক্টোরিয়ার ভেতরকার মিউজিয়াম টা আমার কখনও দেখা হয়নি তাই…আর তা ছাড়া তুমিই তো বলেছিলে কলকাতার এই জায়গাটা তোমার সবথেকে প্রিয়।”
“আমি?কবে বললাম তোমায়?”
“চ্যাটে বলেছিলে। এখন খেয়াল নেই হয়ত”
“বাবারে! তোমার তো ব্যাপক মেমরি”
“মনে না রাখার কোন কারণ নেই পারিজাত। তোমার বায়নাক্কা অনুযায়ী পিটার ক্যাটেই যখন খাওয়াতে হবে, তখন ভাবলাম একটুআগে এখানে আসা যাওয়াই যায়। মনে হল ইউ উইল বি এন ইন্ট্যারেস্টিং কম্পানি”
“ভিক্টোরিয়ায় নিয়ে আগ্রহ এখনও জীবন্ত আছে শুনে ভাল লাগল” ঠোটের কোনে একচিলতে মিঠে রোদ্দুর মিশিয়ে দিল পারিজাত।
“তোমার এরকম কেন মনে হয় বলতো পারিজাত যে আমি আমার বড়ো হওয়া, আমার শহর, আমার ভাললাগা এসব কিছুই ভুলে গেছি।“
“এরকম কোথায় বললাম আমি?” খানিকটা সঙ্কুচিত স্বরেই বলল পারিজাত।
“মুখে হয়ত বলনি কিন্তু তোমার কথায় বোঝা যায়”
“তাই নাকি? অনলাইন চ্যাটে এসব বোঝা যায়?”

প্রশ্নটার উত্তর দেবার সুযোগ পেল না আকাশ। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়্যালের গেটের কাছে পৌছে টিকিটের লাইনে দাড়াতে হল ওকে। পারিজাত তখন বুড়ির চুল কিনতে ব্যস্ত। ভেতরে ঢুকতেই আকাশের প্রায় তথৈবচ অবস্থা। তার লম্বা অনুপস্থিতিতে এই হুজুগে শহরটার জনসংখ্যা প্রায় দশগুন বেড়ে গেছে নিঃসন্দেহে। খানিকটা বিষন্ন হয়েই পড়ল সে। না করলে পারিজাত আবার কি ভাববে কে জানে।
কিন্তু আবারও অবাক হওয়ার পালা তার। পারিজাতের গলার স্বর অন্য খাতে বইছে এবার- “রনি দা পালাও, দেখেছ কে আসছে? দেখতে পারলেই হয়ে গেল”
আকাশ কিছু ভেবে ওঠবার আগেই তার ডানহাতটা ধরে একছুট দিল পারিজাত। দৌড় থামল ময়দানের সামনে থেকে একটা পারক স্ট্রীট মুখী ট্যাক্সিতে উঠে। প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতেই হেসে উঠল পাড়ার পুজোর মাইক দখল, চেয়ার দখল নিয়ে যুযুধান দুই পক্ষ।সহজ, সরল, সাবলীল সে হাসি।

পিটার ক্যাটে বসে খাবারের অরডার দিয়েই আকাশ বলে উঠল- “যাঃ! আমরা ওইভাবে দৌড়ে এলাম, পাপ্পুদা কি না কি ভাববে। পাড়ায় ঢুকতে না ঢুকতেই না পাকড়াও করে”
“তুমি পাগল হলে? ওখানে দাঁড়ালে আমাদের বিয়ে থেকে হানিমুন সব প্ল্যান করে ফেলত”
“এখনও ওরকমই আছে নাকি?”
“একদম” মুখ টিপে হাসল পারিজাত। পরমূহুরতেই আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল দুজনেই। দুজনেরই চোখের কোনে সুখ স্মৃতি রোমন্থনের ঝিলিক।
“সেই মনে আছে আমার,” আকাশ অনাবিল হাসছে, “সেই মোড়ের মাথায় আমাদের দুজনকে কথা বলতে দেখে পরের রোববার আড্ডায় আমার যা অবস্থা করেছিল বন্ধুদের সামনে।”
“ও সত্যিই পারেও বটে- এক নম্বরের গসিপমংগার-ওইসময় একদিন ইংলিশ টিউশন থেকে ফেরার সময় বাসে দেখা- কি বলে জানো?”- পঁচিশের পারিজাতের মুখে ষোলোর কিশোরীর ছায়া।
“কি? ওর সেই প্যাটেন্ট ডায়ালগ- ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিস?”
“হ্যাঁ, বলে ভালই হল আমরা একটা নেমন্তন্ন খাব- কি শখ ওর।”
“আমাকে তো পাগলই করে দিয়েছিল খাওয়া খাওয়া করে”
“খাওয়াতে যাবে কেন?”
“ওর যুক্তি ছিল তুই যাদবপুরে চান্স পেলি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আর ফার্স্ট ইয়ারে ঢুকতে না ঢুকতেই পাড়ার সব থেকে স্নব মেয়ের সাথে প্রেম করছিস- আর কি চাই?”
“তুমি ওকে বলোনি যে প্রেম না, সেদিন আমি তোমার সাথে দাঁড়িয়ে আবার কবে পড়াতে আসবে তা নিয়ে আলোচনা করচিলাম- আমার প্রি টেস্ট চলছিল তখন মনে হয়। আর আমি স্নব, মোটেও না।”
“একটা ভাল বাংলা বলেছিল- কি যেন উন্নাসিক না কি। খুব একটা খারাপ বলেনি বা যদিও। তুমি যা রাগী রাগী চোখে তাকাতে মনে হত এই বোধহয় বকে দিলে। প্রথমবার কোন মাস্টারমশাই ছাত্রীর কাছে বকা খেয়ে যেত মনে হয়।”

এবার না হেসে থাকতে পাড়ল না পারিজাত। সে জানত আকাশ কখনও বন্ধুদের আড্ডায় স্বীকার করেনি তার পারিজাত ভীতির কথা। সেদিন পাপ্পু দার কাছেও কিছুই খোলসা করে বলেনি। তাকে সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে দেখলে আকাশেরর বন্ধুরা যা হাস্যকর আচরন করতো তা দেখলেই বোঝা যেত যে আকাশের এতে সায় আছে। তবুও কখন বিরক্ত হয়নি পারিজাত। মুখে কপট রাগ দেখিয়েছে হয়ত কিন্তু একান্তে হেসেছে নিজের প্রিয় বন্ধুর সাথে ক্লাসরুমে বা ফোনে গল্প করতে করতে।

“মোটেও সেরকম কিছু না। অঙ্ক আমার মাথায় ঢুকতো না, মুখ গোমড়া করে বোঝার চেষ্টা করতাম সাইন থিটা, কস থিটা”- মুখে বলল পারিজাত। হাসিটা তখন তার অন্যমাত্রায়। আলুকাবলি, দুই বেনীর মুক্ত কৈশরে।
“বাজে বোকো না- তোমায় একবার বলেছিলাম টুকুন তোমার ভাল নামটা খুব সুন্দর- তুমি এমন কটমট করে তাকিয়েছিলে আমার দিকে। আর শুধু পাপ্পু দা কে দোষ দিয়ে তো লাভ নেই, তোমার সেই বন্ধুটা, নাইসা না কি যেন নাম তার, সেও কম আওয়াজ দিত না কিন্তু তোমায়।”
“বেশ মনে আছে তো তোমার দেখছি” পারিজাতের র চোখে এবার দুষ্টুমির পারদ টা চড়ছে, “তুমি আমাকে অঙ্ক শেখাতে আসার আগে আমরা নাইসাকে তোমাকে নিয়ে খেপাতাম।”
“যাহ! কেন?”
“লায়ার! ব্লাশ করছ কেন? ক্রিকেট খেলতে গিয়ে সবথেকে বেশী ওর বাড়ির জানলার কাঁচ ভেঙেছ তুমি।”
“সেগুলো মোটেও উদ্দেশ্যপ্রনোদিত নয়” আকাশ এবার দৃঢ় চোখে পরবর্তী কথাটাকে ভাসিয়ে দিল- “তোমার বাড়ির ছাদটা টার্গেট করেই কিন্তু আমার সবথেকে বেশী ছয় মারা।”
পারিজাতও কম যায়না। ভাসা, ভাসা চাহনির মধ্যে দুষ্টুমি মিশিয়ে জিগ্যেস করল – “মাস্টারমশাই হওয়ার আগে না পড়ে?”
“যাই বলো, থ্যাঙ্কস টু মজুমদার কাকু, আমি তোমার মতো একটা ভালো ছাত্রী পেয়েছিলাম, আমার জীবনের প্রথম স্টুডেন্ট হিসেবে।”
“হ্যাঁ, থ্যাঙ্কস টু বাবা’স চয়েস- আমি মাধ্যমিকে অঙ্কটা ঠিকঠাক উতরে গেছিলাম। নয়তো আমার আগের অঙ্ক স্যারের বদলির পর যা খারাপ অবস্থা হয়েছিল আমার”
“আমরা কে কাকে কমপ্লিমেন্ট দিলাম বলোতো?” দুজনের চোখেই একপ্রশ্ন।

দুজনের চেলো কাবাবের অর্ডারই তখন টেবিলে। আকাশ খাওয়া শুরু করার মাঝে একঝলক চুরি করে তাকালো পারিজাতের দিকে। তাকাতেই বিস্মিত হয়ে গেল সে। পারিজাত একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই চাহনিতে শূণ্যতা নেই, ভয় নেই, কিছুক্ষন আগের দুষ্টুমি নেই- কি আছে সেই চাহনিতে?
“কি হলো ম্যাডাম, খাচ্ছ না যে?”
“বিশ্বকর্মা পুজোর দিনটা সত্যিই অন্যরকম ছিল জানো সেবার……”

এরপর এই নিয়ে আর কোনও কথা হয়নি দুজনের মধ্যে। পারিজাতই আলোচনার বিষয়টা ঘুড়িয়ে দিয়েছিল- কবে আকাশ বিয়ে করছে তার ইতালীয় লিভ টুগেদার করা বান্ধবীকে। বাঙালী মতে একটা খাওয়া দাওয়া যেন হয় তা নিয়েও জোর সওয়াল করেছে। আকাশও তেমন বলেছে পারিজাতের আগে বিয়ে করা উচিত। ওর ছবি দেখে নাকি আকাশের কোন জুনিয়র এক্কেবারে ফ্ল্যাট হয়ে গেছে। চাইলে দুজনের মধ্যে অনলাইন ঘটকালিটা আকাশই করে দেবে। পারিজাত ও বিনা যুদ্ধে না ছাড়িব সূচ্যগ্র মেদিনী মনোভাব দেখিয়ে বলেছে আগে আকাশ বিয়ে করবে তারপর দেখা যাবে।
ডিসেম্বর মাসের ভারতভ্রমনটা খুব ভাল কাটল আকাশের। অসম্ভব ভাল একটা বন্ধু পেয়েছে সে পারিজাতের মধ্যে। তার সদ্য ষোলোর পারিজাত সত্যিই অনেক বড় হয়ে গেছে। কথাটা ভেবেই খুব হাসি পেয়েছিল আকাশের। পারিজাত কি কোনদিনি তার ছিল? না কখনও তার হতে পারবে। প্রথম যৌবনের একটা ভাললাগা হিসেবেই থেকে যাবে হয়তো।
জানুয়ারি মাসের ৪ তারিখ নিউ ইয়র্ক পৌছে পারিজাতকে একটা লম্বা ইমেল করল আকাশ। পৌছ সংবাদ ও অন্যান্য কথা জানিয়ে সব শেষে লিখল- “থ্যাঙ্কস পারিজাত, ফর মেকিং দিস ট্রিপ মেমোরেবল।”

উত্তরের অপেক্ষায় রইল সে। দিনে একবার…দুবার…তিনবার মেলবক্স চেক করত আকাশ। কিন্তু পারিজাত উত্তর পাঠায়নি। আকাশ মনে মনে খুব আহত হয়েছিল। একটা মেলের উত্তর লেখার সময় নেই ওর। অনলাইন হয়েও আকাশের চ্যাটের উত্তর দেয়নি ও। ফোন করলে কেটে দিয়েছে লাইনটা। এরকম আচরনের কি কারণ তা আকাশ শত ভেবেও বুঝে উঠতে পারেনি। আসার আগে ওর অত পছন্দের রবীন্দ্র রচনাবলীর সেট উপহার দিতে গেল আকাশ। নিল না ও। খারাপ লাগলেও কিছু বলেনি সে। পারিজাত নিজেও তো কোনো উপহার দেয়নি তাকে- শুধু ওই মনকেমন করা কয়েকটা মুহুর্ত ছাড়া।
দেখতে দেখতে সময় পেড়িয়ে গিয়ে প্রায় সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি। ১৭ ই সেপ্টেম্বর। সকালে অফিস যাওয়ার আগে কিচেন উন্ডোর সামনে দাড়িয়ে নিউ ইয়র্কের ধূসর আকাশটাকে দেখছিল আকাশ। অবিরাম বৃষ্টি পড়ে চলেছে। নিউ ইয়র্কে এরকম বৃষ্টি সে আগে কখনও দেখেনি। হঠাত মনে পড়ে যাচ্ছিল বহু দূরে ফেলে আসা একটা শহরের আকাশ- শরত শুরুর আকাশ, বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ঘুড়ি ওড়ানোর স্বচ্ছ নীল আকাশ।
অথচ কি মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে এখানে। নিজের মনেই গুনগুনিয়ে উঠল-
“এমনও দিনে তারে বলা যায়, এমনও ঘন ঘোর বরিষায়…”

আস্তে আস্তেই গাইছিল। মনিকার যাতে ঘুম না ভেঙে যায়। বেচারী কাল সারারাত ডিউটি করেছে।

ভেবে পাচ্ছিল না সে। তার বড় হওয়ার কলকাতা শহরের বুকে ১৭ই সেপ্টেম্বরের সাথে এই গানটার কোনও মিল নেই । তবুও কোথায় যেন একটা যোগসাজশ রয়েই গেছে। হাতড়াতে হাতড়াতে নিজের মেলবক্স খুলে বসল সে। প্রত্যেকদিন অফিস যাওয়ার আগে একবার করে মেলচেক করে সে। দুনিয়ার অন্যপ্রান্তে যখন সকাল-বিকেলের ভ্রান্তিবিলাস চলছে তখন তাকে কারও মনে পড়ল কিনা একবার চোখ বুলিয়ে নেয় সে।

মেলবক্সে হাজার এক ই-কার্ড জমা হয়েছে নতুন পুরোনো বন্ধুদের থেকে। শারদীয়ার আগাম অভিনন্দন জানিয়ে। বিশ্বকর্মা পুজো মানেই উৎসবের দামামা বাজা শুরু। এন আর আইরা এগুলো আরো বেশী মনে রাখে। এগুলো আঁকড়ে ধরেই বাঁচতে শেখে হয়তো। মা আর জামাইবাবুরো একটা মেল এসেছে। রাতে সময় নিয়ে পড়ে উত্তর দিতে হবে বলে মার্ক করে রাখল সে।

স্ক্রল করে নিচে নামতে গিয়ে থমকে গেল আকাশ। পারিজাতের মেল এসেছে। হঠাৎ এত দিন বাদে কি মনে করে ঠিক ঠাহর করার আগেই ক্লিক করল সে-

“মাস্টারমশাই,
আজকে আরেকটা বিশ্বকর্মা পুজো এসে গেল। আরেকটা ১৭ই সেপ্টেম্বর। আজকেই তোমাকে জানানোর কথা মনে হল। আমি আগামী ২৫এ নভেম্বর বিয়ে করছি। মা বাবাই ঠিক করেছে- ইয়েস! এম গোয়িং ফর এন এরেঞ্জড ম্যারেজ। দেখো আবার বেশী নাক সিঁটকিয়ো না। তুমি তো আর বিয়ে করলে না, আমাকেই হার মেনে নিতে হল। সব সময় জিতেই গেলে তুমি। ১০ বছর আগেও। ১০ বছর পড়েও। ভাল থেকো। কার্ড মেল করছি। আসার চেষ্টাও কোরো না প্লিজ।
পারিজাত”

আকাশ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে কম্পিউটার স্ক্রীনটার দিকে। সামনে তখন জোড়া লেগে যাচ্ছে একের পর এক যোগ বিয়োগের হিসেব।
“শুধুই আঁখি দিয়ে।…আঁখিরো সুধা পিয়ে।…”

এই গানটাই গাইছিল না সেই সদ্য ষোলোর মেয়েটা। ঢাউস হারমোনিয়ামের ওপর ছড়ানো গানের খাতা, সুরসঞ্চারে ব্যস্ত মেয়েটির গলা কি সামান্য কেঁপে উঠেছিল সেদিন। সেদিন যখন মজুমদার কাকু তাঁর মেয়েকে অঙ্ক পড়াতে হবে বলে তাকে ওদের বাড়ি নিয়ে গেছিল। বসার ঘর থেকে সেদিন ছিটকে পালিয়েগেছিল মেয়েটা। যেমন আজও চলে গেল। যেমন এক দশক আগে গেছিল।

মোহর কুঞ্জের বাইরে দাঁড়িয়ে সেদিন তার করা- “তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম যখন তখন কোন টুকুনি ছিলে মনে আছে টুকুন?” প্রশ্নের উত্তরে কি যেন বলেছিল মেয়েটা- “৯ বছর সময়টা একটু বেশীই লম্বা নয় কি?”
মানেটা তখন বোঝেনি আকাশ। গনিতের হিসেবে টুকুন কে তো সে অনেক আগে থেকেই চিনতো। কিন্তু আজকের ১৭ই সেপ্টেম্বরের হিসেবে ধরলে ১০ বছর আগেই কি এই দিনটাতে সে নতুন ভাবে দেখেনি পাড়ার চিরপরিচিত টুকুনকে?- পারিজাত হিসেবে।

অভ্যস্ত ব্যস্তসমস্তটার মধ্যে সে এই দিনটাকেও ভুলেগেছিল। তখন সে খালি ছুটছে সব্বার ঘুড়িকে ভোকাট্টা করে দিয়ে স্বপ্নের দুনিয়ায় পা রাখবার জন্য। ঐ দিনটাও যেন কোথায় মুখ থুবড়ে পড়েছিল। স্মৃতির কোনায় পারিজাতের শত শত কড়া নাড়ায় সাড়া দেয়নি সেই দিনটা। আর আজ এক দশক আগের সেই সকালটা ফিরে ফিরে আসছে তার সামনে।

অঙ্ক পরীক্ষায় ৫ নম্বর ভুল করে এসে গুম হয়ে বসে ছিল স্কুল ড্রেস পড়া একটা মেয়ে। কলেজ ফেরতা আকাশকে বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে দেখে নন্দীনি কাকিমা ডেকে বলেছিল-“রনি একটু বুঝিয়ে দেখ তো”
পড়ার ঘরে ঢুকে আকাশ বলেছিল- “এতো অভিমান করে না পারিজাত”
হাউহাউ করে কেঁদে উঠেছিল মেয়েটা।
আজ যদি অতটা সহজ ভাবে তাকে বলতে পারত আকাশ- “এত অভিমান করে না পারিজাত….”