Tarpan Vidhi Part-2 / তর্পণ বিধি পর্ব – ২

As promised on my blog’s Facebook page – The Big Bong Theory, this is the second part of the three parts of the digitally restored notes from my maternal grandfather in law – Mr Dilip Kumar De’s (Dadu’s) diary about the “Tarpan Vidhi”.

Read the first part here and the third part here.

Typing down such difficult Bangla/Sanskrit on Avro Keyboard has been a tough job, but I will be happy if his work finds a global window and helps people. The digitalisation is not 100% perfect or correct. Apologies for any unintended errors. The remaining parts will be published soon. Read till the end to know more about the remarkable man.

তর্পণ বিধি পর্ব -২

৫/ দিব্য পিতৃতর্পণ

দক্ষিণ দিকে ঘুরিয়া বসিতে হইবে। কোষাকুষি ও জলপূর্ণ পাত্র সামনে রাখিতে হইবে। জলপূর্ণ পাত্রে কৃষ্ণতিল ও তুলসী সর্বদা রাখিতে হইবে। জল ফেলিবার জন্য খালি পাত্রটি পাশে রাখিতে হইবে। একটি আলাদা পাত্রে তুলসীপাতা ও আর একটি পাত্রে কৃষ্ণতিল রাখিতে হইবে, যখন জলপূর্ণ পাত্রের তিল ও তুলসী কমিয়া যাইবে, তখন পুনরায় উহাতে মিশাইতে হইবে।

বাম হাঁটু মাটিতে পাতিয়া ও দক্ষিণ হাঁটু তুলিয়া বসিতে হইবে। পিতৃতীর্থ দ্বারা – অর্থাৎ, কোষাটি জলপূর্ণ করিয়া দক্ষিণ হস্তের তর্জনী ও অঙ্গুষ্ঠের মূল প্রদেশ দ্বারা ধারন করিয়া, এক এক অঞ্জলি জল নিম্নলিখিত প্রতিটি মন্ত্রের সঙ্গে খালি পাত্রে ফেলিতে হইবে। লক্ষ্য রাখিতে হইবে, প্রতিবার অঞ্জলি দেওয়ার সময় যেন জলপূর্ণ পাত্র হইতে কিছু তিল ও তুলসীপাতা কোষায় আসে।

Continue reading “Tarpan Vidhi Part-2 / তর্পণ বিধি পর্ব – ২”

Advertisements

Tarpan Vidhi Part-1 / তর্পণ বিধি পর্ব – ১

Recently, I stumbled upon a family heirloom tucked away in glory inside my mother in law’s belongings. My paternal grandfather in law, late Mr. Biman Behari Ray, had once asked my maternal grandfather in law, later Mr Dilip Kumar De (Dadu) to write down the details of “Tarpan Vidhi” – the ritual of offering water to ancestors on the occasion of Mahalaya, the beginning of Devipaksha, according to the Hindu calendar. Dadu had given him a handwritten diary with all the details mentioned with his usual precision. I do not know if such an admirable and erudite piece about our gradually forgotten traditions is available online or not. At least I have not come across one. So this Mahalaya, just as we begin to celebrate the spirit of Durga Puja, I, his eldest granddaughter in law, intend to pay a tribute to  a scholarly man in this very small way.

As promised on my blog’s Facebook page – “The Big Bong Theory“, this is the first of the three parts of the digitally restored notes from Dadu’s diary about the “Tarpan Vidhi”.  Typing down such difficult Bangla/Sanskrit on Avro Keyboard has been a tough job, but I will be happy if his work finds a global window and helps people. The digitalisation is not 100% perfect or correct. Apologies for any unintended errors. The remaining parts will be published soon. Read till the end to know more about the remarkable man.

Read the second part here and the third part here.

তর্পণ বিধি পর্ব – ১

১/ আবাহন

দক্ষিণে মুখ করিয়ে কম্বলাসনে বসিতে হইবে। সামনে কোষাকুষি থাকিবে, তার সামনে একটি খালি পাত্র, এবং ডান দিকে ১টি বা ২টি জলে ভর্তি পাত্র থাকিবে। দুইবার মন্তপাঠ সহ আচমন করিতে হইবে।

আচমন করিবার বিধি

কোষায় জল ও তুলসীপাতা থাকিবে; বাম হস্তে কুষি ধরিয়ে সামান্য জল ডান হাতের তালুতে লইতে হইবে, ও তাহা দ্বারা আচমন করিতে হইবে। আচমন করিয়া জল খালি পাত্রে ফেলিতে হইবে। আচমন করিবার সময় “নমোঃ বিষ্ণু, নমোঃ বিষ্ণু, নমোঃ বিষ্ণু” বলিতে হয়।

Continue reading “Tarpan Vidhi Part-1 / তর্পণ বিধি পর্ব – ১”

মনের কথা

সেদিন কে একজন বলছিল – “কি রে বাংলায় লেখা বন্ধই করে দিলি নাকি?”

আমি বললাম – “জানোই তো আজকাল এস ই ও, ব্লগ হিটসের এর বাজার। এরমাঝে আমার প্যানপ্যানানি বাংলা লেখা কে পড়বে বলোতো?”

“কেন রে বংপেন তো দিব্যি বাংলায় লেখে”

“কি যে বলোনা? কিসের সাথে কিসের তুলনা?”

একথা, সেকথায়, কথা হারায়, আমারও বাংলা লেখা হয়ে ওঠেনা আজ বহুকাল। এরমাঝে আমার নতুন ব্লগঠিকানা হলো, নিজের নামে। নতুন ফেসবুক পেজ হলো ব্লগের, আরো কত কি…

কিন্তু এই যে খেরোর খাতা, মনের ডায়েরি, যেখানে নিজের গল্প করব বলে এই ব্লগবকম শুরু আমার, সেখানেই আর নিজের বলা বোঝার সব থেকে স্বাবলীল ভাষায় আর কিছু লেখাই হয় না আমার।

IMG_20150711_123648297_HDR (1)

যারা আমার ব্লগ পড়েন তারা হয়তো জানেন যে কিছুদিন আগে আমরা একটা নতুন বাড়িতে শিফট করেছি। নিজেদের কেনা প্রথম বাড়ি। বলতে পারেন, মনের রঙ মিশিয়ে সাজানো। আজকাল কেউ বাড়িতে এলেই ঘুরে ঘুরে তাদের ঘর দেখাই – “এইটা কেমন হয়েছে বলো? আর ওইটা”।

Continue reading “মনের কথা”

Murshidabad through my eyes…

Christmas holidays or “Borodiner chuti” is big in this part of the world. I belong to a city who wears her hat of colonial past with elan and pride and frankly speaking I do not see anything to be ashamed of there either. You cannot change history and if you want to, you belong to the same class of Taliban fellows who were trying to demolish Buddha statues in Bamian, Afghanistan, a few years back. They probably tried a bit too hard to prove that Buddhism had not left its footprints there a few hundred years back. So when anybody asks me what is there to be so proud about Victoria Memorial in Calcutta and why it should be preserved since it is a constant reminder of the British rule in the country, my only answer to them is – my dear! since you asked that question, you made the distinction about ‘class’ and ‘crass’ so clear in front of my eyes 🙂

That part of the rant was necessary, since my chosen destination for spending Christmas holidays with family this year was – “Murshidabad”. Anybody aware about this long forgotten chapter about India’s brilliant past will know that Murshidabad is not only about the famous “Battle of Plassey” that changed the course of the history of the sub-continent. Unfortunately, like many things which I find unbearable about India’s education system, our history books have relegated the pomp and grandeur and the long history of the Nawabs of Bengal and Murshidabad – the last flag bearers of independent Indian rulers in this part of the world, to a mere 8 marks essay type answer in the history answer sheets.

Continue reading “Murshidabad through my eyes…”

পিএনপিসি পর্ব ৩

প্রায় অনেকদিন বাদে ইচ্ছে হল আমার এই গালগল্পের পাতাটা আবার একটু নেড়েচেড়ে দেখি। তার কারণ যে এক্কেবারে নেই তা নয়। কিছুদিন আগে আমি একট অভিজ্ঞতা সঞ্চয়/জোড়দার করলাম- যে কিছু লোক এমন আছে যারা দুনিয়ারাজ্যের যেখান এই থাকুন না কেন, গুল মারতে এদের জুড়ি মেলা ভার।

কি ভাবছেন তো যে এ তো আকছাড়ই ঘটে, বিশেষ করে বঙ্গ সমাজে যেখানে আপনি মস্ত বড় বাজারের থলি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন তো ওমনি পড়শির চোখ টাটাবে। কথায় আছে “বাঙালি কাঁকড়ার জাত”, তাই পড়শির বাড়িতে ২ কিলোর ইলিশ রান্না হচ্ছে টের পেলেই ওমনি পিএনপিসি শুরু।

“আরে নিশ্চয়ই ঘুষ খায়। ভেট দিয়েছে কোন লোক”।

সামনে দেখা হলে কিন্তু অন্য বচন।
“বাহ! ভালো ইলিশ পেলেন দেখছি, তা কোথাকার?”
“হ্যা, ডায়মন্ড হারবারের। একদম তাজা, আজ সকালেই ধরেছে”
“ওহ! আমার আবার ওসব ডায়মন্ড হারাবার টাড়বার চলে না বুঝলেন। আমার পদ্মা ছাড়া ঠিক রোচে না। স্পেশ্যাল অর্ডার দিয়ে আনাই। তা কতো পড়লো?”

যারা পড়ছেন তারা এতক্ষণে নিজের পাড়াতুতো কাকু বা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কারোনা কারো সাথে মিল খুজে পেয়ে গেছেন নিশ্চয়ই। আসলে এরকম আমড়াগাছির দুটো  উদ্দেশ্য থাকে সাধারনতো- এক, পাতি বাংলায় জাকে বলে খোঁজ নেওয়া আর দুই, আদতে যাই হোক বা থাকুক না কেন, অন্যের থেকে বড় হতেই হবে এবং তা করার জন্য গুল মারার থেকে ভালো উপায় আর নেই।

এই যেমন ধরুন আপনি নতুন গাড়ি কিনেছেন হয়তো। লোক দেখানি কেতা মেরে ফেসবুক ভর্তি ছবি লাগিয়েছেন। এদিকে সবাই অভিনন্দন জানালেও ভেতরে কার কোথায় পিন মারছে বেশ ভালোই বুঝতে পারছেন। বলা বাহুল্য আপনি সেটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছেন। কিছু লোক আবার এমন থাকবেই যারা ব্যাপারটা না পারছে গিলতে না পেছে ফেলতে। নিভৃতে চ্যাটে জিজ্ঞেস করবেই-
“তা গাড়ি কিনলি? কতো পড়লো?”
“এই তো লাখ ছয়েক।
“পুরোটাই দিলি? নাকি লোন নিলি?”
আপনি হয়তো বোঝালেন কত ধানে কত চাল, কিন্তু এখনো লোকদেখানির শেষ হয়নি।
“ওহ! ভালো। তবে ছোট গাড়ি কেন কিনলি?”
আপনি বলতে গিয়েও বললেন না হয়তো “আঙ্গুর ফল টক”, কিন্তু মোক্ষম বোমাটা ঠিক তখনই পড়ে-
“আসলে আমার জানিসতো ছোট গাড়ি পছন্দ নয়, ভাবছি নেক্সট ইয়ার আমি একটা হন্ডা সিটি কিনব।”
 তা সেই নেক্সট, টেক্সট মেসেজে নয় নয় করে দু দুটো “হ্যাপি নিউ ইয়ার” পার করে ফেলল, আপনার হয়তো মাঝে মাঝে মনে হয় ডেকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন “কিরে হন্ডা সিটি কি হল?” কিন্তু আবার ভাবেন এই কথাটা বলে বন্ধুমহলে এই হিংসুটে কে নিয়ে খোরাক টা মন্দ হয় না।

এ তো গেলো সমবয়সীদের/বন্ধুদের কথা। আপনার মা হয়তো আপনার গাড়ি কেনার কথাটা গর্ব ভরে ফোন করে আপনার এলা পিসির মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে জানাবেন। প্রায় দু বছর পর হয়তো ফোন করছেন, তাই একটু ভনিতা তো দরকার। তাও আবার যাকে ফোন করছেন, ধরে নিন সম্পর্কে এক কাকিমা হন, তিনি হয়তো বিখ্যাত ভাবে “আমার বেশী টাকা আছে গোছের” গালগল্প করেন। হয়তো বা সেই আলগা তারেই ইচ্ছে করে ছড় কাটতেই ফোন। আহা! আপনার মা কি ভুলে গেছেন আপনার দিদির বিয়ের সময় এই কাকিমা কেরকম গয়নাগাটি আর খরচের বহর দেখে মুখ গোমড়া করে রইলেন সারা বিয়েবাড়ি। ভালো করে কথাও বললেন না। সবাই মুখ টিপে হেসে বলল্ল “স্বভাব গেলো না”।

আবার বছর ঘুরতেই, এই কাকিমার মেয়ের বিয়ের সময় যা হাঁক পাড়লেন। অতি সাধারন বেনারসী আপনার দিদির সাথে তুলনা স্বার্থেই হয়ে গেল “ডিজাইনার” আবার তার সাথে বিনা জিজ্ঞাসায় দামো বললেন “৪৫ হাজার”। নিন্দুকেরা আঁতকে উঠে বললেন “শাড়িটার খোল টাও ভালো না, গয়নাও তো লিকলিক করছে, তত্ত্বর দেখা নেই…গুল মারার জায়গা পায় না”

যাই হোক আপনার মা তো কি গুছিয়ে বলবেন ভেবে নিয়ে ফোন টা করে ফেলেছেন। আপনার সামনের মাসের বিদেশ যাত্রার খবর টাও ভাসিয়ে শুনিয়ে রাখবেন তাও ঠিক করেছেন।

“হ্যালো, দীপা?”
“হ্যা, কে বলছো? রমা নাকি?”
এবার খানিকক্ষণ কে কেমন আছে, কতোদিন পরে জোগাজোগ, শরীর টরীর নিয়ে আপোনার মা অনেক ভনিতা করলেন। তারপর নেমে পড়লেন “টেক্কা দেওয়ার” খেলায়।
“একটা সখবর দিয়ি তোমায় দীপা, আমার ছেলে জানোতো গাড়ি কিনেছে।”
আপনার মা মনে মনে তারিয়ে তারিয়ে ভাবছেন কেমন ছাই রঙ এর হয়ে গেল দীপা কাকিমার মুখটা। জবাবেও বুঝতে পারলেন।
“ওহ!”
“হ্যাঁগো ব্র্যান্ড নিউ।”
“হ্যাঁ আজকাল তো এতো ছোটছোট গাড়ির কিচির মিচির। সারা রাস্তা জুড়ে ভিড়” খেলায় খানিকটা সামলে নিলেন দীপা কাকিমা।
আপনার মা তো রেগে আগুন। নিজের মেয়ে হলেই এতক্ষণে গাড়িটার এমন গুনগান করতেন যে মনে হতো ওতাই দুনিয়ার সেরা গাড়ি। ফেরারি তো তুচ্ছ।
“হ্যা, ক্ষমতা থাকলে কিনে নেয়। তা দীপা তোমার মেয়ে জামাইয়ের কি খবর?” প্রশ্নটা যে শুধু কুশল বিনিময়ের জন্য করা তা দীপা কাকিমা আর আপনার মা দুজনেই ভালো করে জানেন। আপনার মা র উদ্দেশ্য অবশ্যই খোঁচা মেরে আপনার বিদেশ যাত্রার খবরটা জানানো। তলে তলে বেশ ভালোই খবর রাখেন, কবের থেকে ম্যানেজারের সামনে হাত পা থেকিয়ে, তেলের বোতল নিয়ে বসে আছে কর্তা গিন্নী ওরফে দীপা কাকিমার মেয়ে জামাই। উদ্দেশ্য কোন্মতে যদি একবার কালাপানি পেরোনো যায়। অনসাইট, অনসাইট করে যে দীপার জামাই পাগল হওয়ার জোগাড় তা নিয়ে আপনাদের বাড়িতে আগেই একদিন জব্বর পিএনপিসি হয়েছে, আপনার পিসে আর ওই যুগল একই অফিসে কাজ করে কিনা।
“ভালোই আছে। আমার জামাই তো এখন দারুন প্যাকেজ পাচ্ছে, জানো এবঅছর আমার মেয়েও ৩০% ইঙ্ক্রিমেন্ট পেয়েছে। এই নিয়ে এই বছরে এই থার্ড টাইম। এখন তো ওর প্যাকেজ প্রায় ৬০ লাখ”

আপনার মার পিলে প্রায় চমকে যাওয়ার অবস্থা। দীপা কাকিমা বা যারা এরকম টেক্কাবাজির খেলাতে অভ্যস্ত, তারা ধরেই নেন সাম্নের লোকটি এক্কেবারে অগা। আপনার পিসে যিনি অভিজ্ঞতার সুবাদে দীপা কাকিমার মেয়ে জামাইয়ের অফিসেই আরেকটু উচুদরের কর্মচারী তিনি সেদিন দুঃখ করছিলেন যে সামান্য প্রফিট কম হওয়ায়, এবার নাকি সব ইঙ্ক্রিমেন্ট বন্ধ করে কস্ট কাটিং করছে কোম্পানি।  আপনার মা ও এই সুযোগ ছাড়বেন কেন? বললেন- “ও, তাই নাকি? ভালো তো, তবে ওদের ওই অনসাইট টা হলো না না?”
দীপা কাকিমা আমতা আমতা করছেন দেখে, আপনার মা বাজিটা খেলে দিলেন- “এই দেখো বলতেই ভুলে গেছিলাম, আমার ছেলেকে জানোতো বাইরে পাঠাচ্ছে কোম্পানি থেকে।”
প্রায় অদ্ভুত একটা নীরবতার পর দীপা কাকিমা বললেন-
“তাই, ভালো…রিঙ্কি আর ওর বর তো চাইলেই যেতে পারে। তা কোথায় যাচ্ছে?”
“এই তো আমেরিকা। ওখানে ডলার রোজগার করে আসুক কিছুদিন। এখানে আচ্ছা আচ্ছা লোক যা পায়, তা ও দু তিন মাসে রোজগার করবে।”
পিনটা বেশ ভালোই ফুটলো মনে হয় কারণ আপনার মাকে হয়তো কথাটা না শেষ করতে দিয়েই দীপা কাকিমা প্রায় হামলে পড়ে বলে উঠলেন- “হ্যা, হ্যা, জানি জানি। আমার মেয়ে জামাইয়ের ও তো সিঙ্গাপুর চলে যাওয়ার কথা। আজকাল তো আবার জানোতো আমেরিকা কেউ যেতেই চায় না। সিঙ্গাপুরে অনেক বেশী টাকা।”
“কি যে বল, টাকা দিয়েই সব হয় নাকি। সিঙ্গাপুর কে তো বলেই “পুওর ম্যান্স ইউ এস এ”, শুনেছি খুব খাটায় নাকি, আর যাই বলো আমেরিকান ডলারের দামটা কিন্তু এখন সিঙ্গাপুর ডলারের থেকে বেশী।”
অর্থনীতির ব্যাপার টায় কেঁচে গেলেন দীপা কাকিমা। এই ব্যাপারে রিঙ্কি কে না জিজ্ঞেস করেই একটা বেমালুম বলে দিয়েছেন, বেশী না বলাই ভালো আর।
কিন্তু আপনার মা ছাড়বেন কেন, পাকা ঘুটি কপাত করে খেয়ে ফেলার সময় এসে গেছে।
“তা কবে যাচ্ছে গো তোমার মেয়ে?”
“এই তো, ঠিক হলে তোমাদের জানাতাম। আসলে ওরা ওখানে একটা ফ্ল্যাট কিনে এক্কেবারে যাবে।”
আবার অবাক হওয়ার পালা আপনার মার। দীপা কাকিমার মেয়ের যখন বিয়ের পর পাসপোর্ট হল তখন সে কথা সবাইকে ফোন করে করে জানিয়েছিল। আর সে কিনা এরকম খবরটা চেপে রেখেছিল এ বিশ্বাস করা কল্পনার ও অতীত। গত তিন বছরে নিদেন পক্ষে নিউ টাউন না হোক রাজারহাটে ও এক টা ফ্ল্যাট কেনেনি, আর বাগুইহাটিতে ভাড়া বাড়িতে থেকে সল্ট লেক বলে চালায়, তারা আবার কিনছে সিঙ্গাপুরে ফ্ল্যাট। মেজাজ টাই বিগড়ে গেল আপনার মার। একথা সেকথা র পড়  ফোনটা রেখে দিলেন। ভাবলেন কেন যে ফোনটা করতে গেছিলেন।

আপনারও এরকম মনে হয় নিশ্চয়ি। যখন দেখেন ব্লাফবাজিতে পারদর্শী কিছু লোক নিজেরা কিছু করবে না, কিন্তু অন্য কেউ কিছু করলেই একইসাথে সেটা ছোট করবে আবার এমন আকাশচুম্বী গুল মারবে যে সবাই জেনেও হাসবে না কাঁদবে ঠিক করতে পারবে না।

আমার সাথেও এরকম মাঝে মাঝেই হয়। ওপরের কথাগুলো কাল্পনিক, চরিত্রগুলোও। কিন্তু সার সংজ্ঞা টা কাল্পনিক নয়। আমাদের প্রত্যেকের প্রত্যাশার পারদ উপরে উঠতে উঠতে এমন জায়গায় পৌছয় যে সেখান থেকে ফিরে আসতে অনেকেই পারে না। এই গুলবাজ রাও না। অস্বীকার করে লাভ নেই যে আমরা কেউই সত্যবাদী জুধিষ্টির নই, সময়ে অসময়ে আশে পাশে আমরাও গুল মার। কিন্তু জখনি দেখবেন কেউ ঊর্ধ্ব তর স্তরে গুল মারছে, তখন তাকে ভুলটা শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। কারণ তা আপনার মূল্যবান সময়ের অত্যাধিক অপচয়। উল্টে খোরাক করুন। কারন এর থেকে ভালো “কমেডি নাইটস” আর পাবেন না জীবনে। আর ঘরোয়া আড্ডায় বা বন্ধুদের সঙ্গে পিএনপিসি তে এগুলোই জমে ভালো।

পুনশ্চ – এবারের পর্বটা পড়ে মনে হতেই পারে যে এই খোজ নেওয়া এবং অন্যকে অগা ভেবে গালগল্প ঝাড়ার সুযোগ টা বঝি বাবা কাকা বা মা মাসি পিসি স্থানীয় লোকেরাই নেন। আজ্ঞে, সে গুঁড়ে বালি, কারণ স্বভাব জিনিসটা কোন বয়স, আয়সীমানা, প্রথাগত শিক্ষা দীক্ষার ধার ধারে না। পরের পরবে সেরকমই কিছু নিয়েই  পিএনপিসি করবো ভাবছি।

পিএনপিসি পর্ব ২

পিএনপিসি পর্ব ২
যারা আগের পর্বটা পড়েছেন তারা জানেন যে এ হচ্ছে অনলাইন গাঁজাখুরির আরেক নাম। পিএনপিসি যে কি লোমহর্ষক জিনিস সে ব্যাপারে তো আগি বলেছি। তাই বেশী গৌরচন্দ্রিকা না করে সোজা কথায় আসি। এই পর্বের গপ্পোটা হয়তো আমাদের অনেকের চেনা কারণ আমরা যারা সুন্দরী পাড়াতুতো দিদিদের প্রেমকাহীনি নিয়ে এককালে মস্ত লোপ্পা ক্যাচ ক্যাচ খেলতাম, তাদের কাছে এ গল্পের বিষয়বস্তু নেহাতই আমড়াগাছি। ও, আর আগেভাগে বলে নেওয়া ভালো যে ভালো এ গল্পর সব চরিত্র কিন্তু প্রায় কাল্পনিক। কারো বিবাহিত জীবনে ব্যাঘাত ঘটানোর দায় মোটেই আমার নয়।
যা বলছিলাম। আমাদের পাড়ায় এক দিদি ছিলেন, যাকে দেখলে পড়েই আমাদের ওই পাড়ার মোড়ের চাওয়ালা কাকু একটা লেরো বিস্কুট এমনি এমনি খেতে দিতো।হাসিমুখে। ওই যখন আমরা রোজ সকালে স্কুলবাস ধরার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতাম আর  ফুলটুসিদিরোজলেটকরেআসতো।বাসেরহেল্পারকাকু (বাবুয়া কাকু) কিন্তু রোজ ওর জন্য দাঁড় করিয়ে রাখতো বাসটা। কি রাগই না ধরতো তখন। আমরা কেউ লেট করলে বকাবকি আর রোজ ফুলটুসিদির জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। দেতো হাসি দিতো আমরা কেউ বাবুয়া কাকুকে এই নিয়ে কিছু বললেই। একবার তো আমি ভুল করে ফুলটুসি দিদের বাড়ির ল্যান্ডলাইন নাম্বারটা বাবুয়া কাকুকে বলতেই, ৬ টাকার বড়ো আলুকাবলিটা খাইয়েছিল। ভুল করে কারণ, আমাদের পাড়ারই বপি দাদা প্রায় একমাস বাসে জায়নি, আর যাবে কিনা জিজ্ঞেস করতে বাবুয়া কাকু ওর ফোন নাম্বার টা চেয়েছিল ড্রাইভার কাকুর কথামতো। আমায় জিজ্ঞেস করতে আমি গড়গড় করে বলে দিয়ি নাম্বারটা। ওমনি ফুট কেটে সোনাই বলে, আরে ওটা তো ফুলদিদের বাড়ির নাম্বার। বপিদের নাম্বারের শেষে ৫ আর ফুলদিদের ৪। 
আমি ভুল শুধরোব কি, দেখি বাবুয়া কাকুর সে কি হাসি, পুরো শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ টাইপের হাসি। বাবুয়াকাকুর খোয়াবে তখন ও পোসেনজিত আর ফুলটুসি দি ঋতুপর্ণা। যাইহোক, এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন, যে এহেন ফুলটুসির দিওয়ানাদের লিস্টটা ইয়া লম্বা। সেখানে এই বাবুয়া কাকু বা চাওয়ালা কাকু আমাদের শ্রেনী বিভাজনের ইতিহাসের মতোই একদম নীচের দিকের কন্টেন্ডার। পাড়ার বড়লোক বাপের বখাটে ছেলে থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিকে র‍্যাঙ্ক করা ছেলে সব্বাই পূজোর সময় ফুলটুসি দির সাথে অঞ্জলি দিতে হেব্বি আগ্রহী। অনেকেই আবার কায়দা মেরে আলাপ জমাতেও চেষ্টা করে। যেমন ওই উচ্চমাধ্যমিকে র‍্যাঙ্ক, আই আই টি টপার ছেলেটি যখন জানতে পারলো যে ক্লাস ১২ এর টেস্ট পরীক্ষায় ফুলটুসি দি ধেড়িয়ে কাত, তখন এগিয়ে গিয়ে বলল-
হাই ফুলটুসি, আই হার্ড এবাউট ইয়োর র‍্যাজাল্টস ফ্রম আন্টি। ইফ ইউ ওয়ান্ট আই ক্যান হেল্প ইউ আউট”
কথায় আছে সুন্দরী মেয়েদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে তাদের ন্যাকামো। সে ডিপারটমেন্টে ফুলটুসি দি মোটেই কম ছিলনা। ঘাড় ঘুড়িয়ে জবাব দিল।
হাই দীপ, প্লিজ ডোন্ট কল মি বাই দ্যাট ঘাস্টলি নেম। কল মি ঝিনুক। মাই গুড নেম।”
অলরেডি ঘায়েল দীপদা সেই মুহূর্ত থেকে মরিশাসের সমুদ্র সৈকতে ফুলটুসি দির সাথে ঝিনুক কোরানোর স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। 
এদিকে বখাটে রাজা দা ও কম যায় না। যতই সে মস্ত ওচাদের নাইট কলেজে পড়ুক, পাড়ায় তার মতো বাইক কারো কাছে ছিল না। আর সরস্বতী পূজোর সময় আমাদের এক গন্ডা বাচ্চা পার্টির কোল্ড ড্রিঙ্কস খাওয়ার টাকাও সে একাই দিতো। যেই না শুনলো সে বিদ্যার বহরের কথা, ওমনি সে বাইক হাঁকিয়ে অষ্টমীর দিন পৌছলো ফুলটুসিদির বাড়ির সামনে। নতুন কেনা মোবাইল ফোন টা বের করে (সময়টা ৯০ এর মাঝামাঝি খেয়াল রাখবেন) তাকে ডাকল নীচে। বলল-
হাই, নলবনে দারুন একটা ডান্ডিয়া পার্টি হচ্ছে, তুমি যাবে আমার সাথে। ৫০০ টাকা করে কাপল পাস।”
ওয়াও”- ফুলটুসি দির মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে শুধু নলবন কেন, তারা যে তারপর তন্ত্রাও যাবে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।
 এই পুরো ঘটনাটা আমার নিজের চোখে দেখা। আমি আর আমার পাড়ার বেস্ট ফ্রেন্ড পঞ্চু বেগুনী খেতে খেতে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিলাম দৃশ্য টা। একটা বেট ও লরে ফেলেছিলাম যে কে জিতবে শেষ পর্যন্ত। কিন্তু বড়দের নাক গলাতে হল ঠিক তক্ষুনি। পাড়ার সবার জ্যাঠা ভোম্বল জ্যাঠু এসে আমাদের এক খেদানি দিলেন।
এই যা এখান থেকে। সারাদিন পাকামি করা…আর এই রাজা এসব কি হচ্ছে শুনি। এটা ভদ্রলোকের পাড়া। এক হাত দূরে আমরা বসে আছি দেখতে পাচ্ছিস না। লজ্জা করে না, তোর বাবাকে বলছি দাড়া।”
রাজা দা বা ফুলটুসি দি কি করল জানি না, আমরা দুজন দে ছুট। এতবড় হট নিউজ টা বাড়িতে না বললে চলে। মাইভ ঝাড় খাচ্ছে দুজন দাদা দিদি। পঞ্চুদের বাড়িটা আগে পড়ে। বাড়ি ঢুক্তে না ঢুকতেই শুনি ল্যান্ড ফোনটা বাজছে। মা ই ধরল। তারপরের কথোপকথনের একটা দিকি শুনতে পেলাম-
কি? কি অবস্থা! কি সাহস ভাবো!”
হ্যা, হবে না কেন… যেমন মা বাবা, তেমনি মেয়ে।”
……
পাড়াটার বারোটা বাজিয়ে ছাড়ল। ওই জন্যই তো আগের বার ওর জন্মদিনে যেতে দিয়িনি মেয়েকে।”
……
আবার ওদিকে আমাকে সেদিন নন্দিনী বলল, দীপ কেও নাচাচ্ছে। কি গেছো মেয়ে”
……
আর বল কি! ভালো ছেলেটার মাথা চিবিয়ে খেল”
ঠিক বলেছো। মার শাসন নেই। উলটে আস্কারা আছে।”
……
হ্যাঁ, হ্যা। মনে পড়েছে। ওই সরস্বতী পূজোর দিন তো। দেখেছি। কি পিঠ কাটা ব্লাউজ পড়েছিল না মেয়েটা।”
……
সত্যি কি ঢলাঢলি। বলি তার দুদিন পড়ে টেস্ট তোর শাড়ি পড়ার দরকারটা কি রে? অতো সাজগোজ।”
……
উমম! এদের একজনকেও বিয়ে করবে নাকি দেখো…ওর মা তো বলে মেয়ের জন্য এমন জামাই আনবো না দেখো। সবাই হা হয়ে দেখবে।”
আমি বোঝার চেষ্টা করলাম হঠাত বিয়ে কোথা থেকে এল। ততক্ষণে মার ফোন শেষ। আমাকে দেখেই বললেন- “এই তুই ছিলি না তখন…একদম বেশী মিশবি না। ওইসব নলবন টন কিন্তু খুব খারাপ জায়গা।”
মার বকা খেয়ে আবার পূজো মন্ডপে যাচ্ছি। পাড়ার কাকুদের জটলা র সামনেই ছিলাম। শুনতে পেলাম-
কি আর বলব, বড়দের কোন সম্মান পর্যন্ত করে না।”
আরে মশাই, মেয়েটার অডাসিটি দেখে তো আমার মাথা ঘুরে জায়…ছেলেটা ডাকল আর তুই ক্লাস টুয়েলভে পড়িস মাত্র…ওমনি ধেই দেই করে নাচতে নাছতে চলে এলি।”
আরে বোসদা, সেদিন আপনি কি দেখেছিলেন বলুন না। ওই যে সেদিন আমাকে বলছিলেন অটোস্ট্যান্ডে”
আরে হ্যাঁ ভায়া। আর কি বলব। ওই যে মিত্তির দের ছেলেটা আছে না…তাকে পর্যন্ত ছাড়েনি। আমি সামনে দিয়ে যাচ্ছি কোন হোলদোল নেই। সে কি গল্প দুজনের পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে। আমার গিনী আবার বলল, ও নাকি ফুলটুসি কে কম্পিউটার শেখায়। কি শেখার ছিরি।”
আরে আমার মেয়েটা বলল ওদের নাকি আবার কি সব পারফিউম সেট দেখিয়েছে। ওই রাজা দিয়েছে মনে হয়।”
না, বুঝলেন। সেন বাবুকে ডেকে ওনার মেয়ের ব্যাপারে বলা উচিত কিন্তু।” ভোম্বল জ্যাঠু মন্তব্য করলেন।
আরে ছাড়ুন তো। আমরা কেন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবো। তাদের ব্যাপার তারা বুঝুক। আমরা মজা দেখি।”
কেউ একটা বলে উঠল। খেয়াল নেই কে। সঙ্গে বিশাল হাসির রোল। আমি তখন ভাবছিলাম, কারা যেন বলে পিএনপিসির ব্যাপারে একমাত্র মেয়েদের আধিপত্য?
বলা বাহুল্য সেবারের পূজোর বাকি সবকটা দিন এবং তারপরে আরো অনেক দিন আররো অনেক মশালাদার আলোচনার মুখ্য বিষয় ছিল ফুলটুসি দি। আজ এতোদিন পর ভাবি, কেউ রাজা দার বাবাকে কমপ্লেন করার কথা ভাবল না কেন? ওর বাবা অনেক টাকা দিত পূজোর জন্য বলে? আর দীপ দা? ও আই আই টিতে পড়তো বলে?

 

টুকরো ছবি

টুকরো ছবি
 
 
“তাহলে প্রিয়গোপাল বিষয়ী থেকেই কিনছিস তো বেনারসীটা?”
সেক্টর ফাইভ লাগোয়া সিসিডী তে বসে দুই বান্ধবির কথোপকথন তা অনেকক্ষন ধরে শুনছিল অনিন্দ্য। পথচলতি পিএনপিসি, আসছে অগ্রহায়ণে বিয়ের শপিং, সোনার বাজার দরের ওঠানামা, কোন বান্ধবী সবছেয়ে জম্পেশ বর পাকড়াও করেছে থেকে কোথায় হানিমুনে যাওয়া যায়- সবই সেই আলচোনার অংশ। কাছাকাছি কোন বহুজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কর্মী দুজনেই সেটা ট্যাশপনা দেখলেই বোঝা জায়। সদ্য চাকুরিতে ঢুকেছে বোধহয়, এখনও দাস্বত্বের রঙিন স্বপ্নের ঘোর লেগে আছে কথাবার্তায় বোঝা যায়।   
অনেক ক্ষন ধরেই অদের কথায় আড়ি পাতছিল অনিন্দ্য। মাঝে মাঝে করে সে এরকম। কিছুটা একঘেয়েমি কাটানোর জন্য শুরু করেছিল অভ্যেস টা।।এখন অনেক টাই নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম প্রথম যখন বর্ধমানের বাড়ি ছেড়া কলকাতায় পড়তে এল, যাদবপুরের কাছেই একটা মেসবাড়ি ভাড়া করে থাকতো তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে। তখন এত একঘেয়েমি ছিল না জীবনটায়…এই শহরটাকে এতটা অপরিচিত কিউবিকল সর্বস্বও মনে হত না। এখন তার কাছে বড়সর মাপের একটা চাকরী আছে। পরিচিতের পরিধি টা অনেক বেরেছে কিন্তু বন্ধুর সংখ্যা ক্রম হ্রাস্যমান। তাদের কেউ কেউ চলে গেছে গুড়্গাওন, কেউ মুম্বাই…কেউ বা সুদূর বিদেশ। কেউ কেউ হয়তো আছে এখনও এই শহরে কিন্তু সবাই প্রচন্ড ব্যস্ত।
খবরে কাগজে কলকাতার সম্বন্ধে মাঝেই যারা ভিক্টোরিয়ার ছবি লাগিয়ে এক্তা আদ্যন্ত কর্ম বিমুখ শহরের ছবি তৈরি করেয় তাদের সাথে দেখা করা অনিন্দ্যর মাঝে মাঝে এই ডেডলাইন মুখর দ্বীপের একটা গাইডেড ট্যুর দিতে ইচ্ছে করে।
মেয়ে দুটো উঠবে উঠবে করছে। ঘড়ির দিকে তাকালো অনিন্দ্য। ঈশ! আজ অনেক দেরী হয়ে গেল। প্রত্যেকদিনের আধন্টার অবসর কখন যে দেড় ঘন্টা অতিক্রম করেছে খেয়াল ই নেই তার।
মেয়ে দুটো বেশ। রোজকার আশেপাশের টেবিলের প্রোমোশন, বসের গসিপ এর থেকে একটা অন্যরকম আলোচোনা উপহার দিল তাকে। অনিন্দ্য কুবি নয়।।নয়ত কিছু লিখতো হয়ত। একবার ভাব্ল আলাপ করবে ওদের সাথে।।কিন্তু পর মুহূর্তেই ভাবল কি বলবে তারপর? তাদের কথায় আড়িপাততে প্রায় মাঝবয়সি অনিন্দ্য রায়ের ভাল লেগেছে?

মেয়েগুলো হয়তো তার পদমর্যাদার কদর করে “ঠিক আছে” গোছের উত্তর দেবে হাসিমুখে। এরকম স্তাবকতায় সে অভ্যস্ত। হয়তো বা পরে সে সদ্য বিবাহবিচ্ছিন্ন  শুনে তার গায়েপড়ে আলাপ টাকে “আলুর দোষ” বলবে। এ এক আচ্ছা মুশকিল। আগে জনমত নির্বিশেষে অফিসের সবার সাথে আড্ডা মারত অনিন্দ্য। পরে দেখল নতুন জয়েন করা কিছু মেয়ে একটু বেশীই কদর করছে তার পথচলতি ছবি আঁকার। কয়েকজন আবার বলতে আরম্ভ করল সে নাকি বিশাল ফ্লারট।

মাঝখান থেকে তার অফিসের লাগোয়া কফিশপ টায় যাওয়াই বন্ধ করে দিল সে। বেশী মেলামেশাও। এখন এখানে আসে সে। বেশী দূরে না, আবার কাছেও না। হাটাপথে মিনিট দশেক।
প্রত্যেকদিনের আধঘন্টার অবসর।
বিলটা মিটিয়ে বেড়িয়ে গেল অনিন্দ্য। অতিলোভ করে সোম থেকে শুক্রর এই আধঘন্টা টা হারাতে পারবে না সে। এই একঘেয়েমি, কর্মব্যস্ততার শহরে তো একেবারেই না।
 
 
“দেখো এই বাড়ির মেনটেনেন্সের যা খরচ তা আমাদের পক্ষে চালানো অসম্ভব বৌদি। বেকার সেন্টিমেন্টাল না হয়ে আমার প্রস্তাব টা ভেবে দেখো। আমাদের বাড়ির দারুন লোকেশন টা দেখেই কিন্তু মিঃ মুরারকা বাজার চলতি দরের থেকে অনেকটায় বেশী অফার দিচ্ছেন।”
একনাগারে নিজের কৌশিকের কথাগুল শুনছিল কাজরী। দেশপ্রিয় পার্কের বাসিন্দা, এই একদা বিত্তবান সেনগুপ্ত পরিবারের বধূ হয়ে যখন কাজরীর এই বাড়িতে প্রবেশ তখন কৌশিক সদ্য কলেজে ঢকেছে। মনে আছে ওর বিয়েটা কায়স্থ বাড়ির মেয়ে পরমার সাথে ঠিক করার পেছনে কাজরীর ভূমিকা অনেকটাই।
আর আজ সেই কৌশিক ই কিনা একেবারে গারজিয়ানের ঢঙে তাকে আদেশ করছে এই বাড়িটা বিক্রি করে দিতে সম্মত হতে। আদেশ ঠিক নয়, তবে হ্যা, যবে থেকে তার বৈধব্য সত্ত্বা তাকে গ্রাস করেছে, সে লক্ষ্য করেছে এ বাড়ির সবাই তার সব সিদ্ধান্তে নিজেদের অগ্রাধিকার দেখাতে চেয়েছে। তা সে তার মেয়ে টুয়া কি নিয়ে পড়বেই হোক বা তার নিজের কতটা অর্থসাহায্য চাই তা নিয়েই হোক।
টুয়ার বাবা মারা যাওয়ার পর কাজরীর পাশে সবাই এসে দাড়াতে চেয়েছিল। একদিক দিয়ে তো ভালই। সবাই বলল “বাবা! আজকাল কার দিনেও এরকম দেখা যায় নাকি?”। কাজরীর তো খুশী হওারি কথা।
কিন্তু কোথাও যেন তার এই মহানুভবতার পেছনে একটা করুনার গন্ধ লেগেছিল। সারাজীবন যা প্রত্যাখান করে এসেছে কাজরী। সেইবার সবার সামনে একবার বলেছিল যে সে একটা চাকরীর চেষ্টা করবে ভাবছে…ওমনি সবাই রে রে করে উঠেছিল। ছোট ননদ বুকাই তো বলেই ফেলল- “ছি! বৌদি, এরকম বলতে পারলে তুমি? আমরা কি তোমার পর?”
“বৌদি ভেবে দেখ কিন্তু কথাটা”
কৌশিকের কথায় আবার সম্বিত ফিরল কাজরীর।
“হ্যা, ভাবছি।।কবের মধ্যে জানাতে হবে বললে?”
“যত তাড়াতাড়ি সম্ভব” চাটা শেষ করচে করচে বলল কৌশিক “আসলে ডিলটা এত ভাল পাচ্ছি, বুঝতেই পারছো তো। ভয় লাগছে যে দেরি হয়ে গেলে হাতছাড়া না হয়ে জায়”
“হ্যা সে তো ঠিকি। আসলে তোমায় সেদিন ও তো বললাম না…তোমার দাদার এত স্মৃতি এই বাড়িতে…তাই ঠিক…” আমতা আমতা করে বলল আবার কাজরী।
“আহ! দাদার স্মৃতি কি একার তোমার বৌদি? এ বাড়িতে আমার শৈশব কেটেছে। বাবা মার স্মৃতি আছে…এই পাড়া…এখানে ডাংগুলি খেলেয় বড় হলাম…।সেই বাড়ি ভেঙে একটা বাহারি শপিং মল হয়ে যাবে, আমাদের ঠাকুরদালান কৌলিন্য হারিয়ে সবার কাছে আরেকটা বিনোদনের জায়গা হয়ে যাবে, সেটা কি আমার ভাল লাগছে বৌদি? তবে একগুয়ে হয়ে তো লাভ নেই……এই বাড়ির খরচ বা মেনটেন করা আমাদের আর পোশাবে না। যা দিনকাল দাড়াচ্ছে, আমাদের কতটুকুনি বা পুঁজি বলোতো?”
“হু!”
“তাছাড়া, এমন কিছু বাজে হচ্ছে না… গড়িয়ার কাছে মিঃ মুরারকার যে নতুন আবাসন তৈরি হচ্ছে তাতে নতুন ফ্ল্যাট, আর বেশ অনেক টাই টাকা। তোমারো তো ভবিষ্যৎ আছে একটা বৌদি…টুয়ার বিয়ে আছে…আর আমরা তো কাছেই থাকব সবাই। একি কমপ্লেক্সে। একদম ঝা চক চকে সবকিছু। আজকাল যেরকম হয় সব। আমাই একদিন দেখে এসেছি…ইয়া বড় বড় ৬ টা টাওয়ার। দেখবে টুয়ার দারুন লাগবে।”
“হ্যা…তবে গড়িয়া এখান থেকে বেশি দূর হয়ে যাবে না?”
“আরে গড়িয়া তো এখন শহরের মধ্যেই বলে… আমরাই যা ভাবি এরকম। টুয়া র ও কলেজ কাছে হয়ে যাবে অনেক। বেশী ভেবো না আর…আমি পরশূ আসব আবার ফাইনাল শুনতে। টুয়ার সাথে কথা বলে রেখোখন।”
বেরোবে বলে তৈরি হল কৌশিক।
“আচ্ছা, আমরা ছাড়াও তো আর বাকি অংশিদার আছে তাদের কি মতামত?”
“আরে সবাই রাজি…এতোভাল অফার টা…নন্তুদারা তো ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আমায় পাওয়ার অফ এটর্নি দিয়ে দিয়েছে। ওরা কমপ্লেক্সের ফ্ল্যাট টা নিয়ে খুবি খুশি। নন্তুদা না কি এরমি একটা প্রোপার্টি তে ইনভেস্ট করতে চাইছিল। আর বাকি বোনেরাও যা ক্যাশ পাচ্ছে তাতেয় খুশি।”
“ওঃ তাই…ভালো তো”
“হু! ডিল টা হয়ে জাক…তুমিও আমায় ধন্যবাদ দেবে দেখো…আসি তাহলে…পরশু ফাইনাল করে রেখ সবকিছু…তুমি হ্যা বলার পর রাজ্যের কাজ আছে।।জমি বাড়ির ব্যাপার তো”
কৌশিক চলে যাওয়ার পর তার অংশের সুদর দরজাটা বন্ধ করে দিল কাজরী। টুয়া কলাজ থেকে ফিরতে এখন অনেক দেরী। এখন তার অখন্ড অবসর। অনান্য দিন এই সময় টুকুর দিকে মুখিয়ে থাকে কাজরী। গান শোনে। শখের কবিতা লেখে, বই পড়ে। টুয়ার বাবার স্মৃতি চারনা করে মাঝে মাঝে হয়ত।।কিন্তু আজকাল খুবি কম হয় সেগুলও।।হয়ত অভ্যেস। টুয়ার যখন চার বছর বয়শ তখন হারিয়েছে মানুষ টাকে। আজ টুয়াও নয় নয় করে ২০ তে পা দিয়েছে প্রায় সাড়ে চার মাস।
কিন্তু কি আশ্ছরজ আজ তার আর কিছু ভাল লাগছে না…সমানে টানছে ওই সামনের গাড়ি বারান্দাটা। কি জানি কি পিছুটান থেকে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো কাজরী। আর মুহূর্তে তের বয়শ কমেয় গেল প্রায় ২২ টা বছর। জীবন সংগ্রামে ক্লান্ত বিধ্বস্ত এক প্রৌড়া কাজরী নয়…সে তখন সদ্য একুশের পরশ মাখে লাল শাড়ি আর শাখা পলার সাজে মায়াবি এক কাজরী। তখন এ বাড়িটায় এক্সাথেয় হাড়ি চরতো প্রায় ৪০ জন লোকের। সদ্যবিবাহিতরা আজ যে স্পেস পেয়ে অভ্যস্ত, তার কিছুই ছিল না তাদের জীবনে। রাত ১১ টা পর্যন্ত তাদের শোবার ঘরে তখন আসর জমাতো একপাল ননদ দেওর রা।
কিন্তু ভাগ্যিস ছিল না…নয়ত কি আর ২২ বছর পর এক দুপুরে তার মনে পড়তো যে এই গাড়ি বারান্দা তে বসেই একদিন মাঝরাতে তাকে তাদের দাম্পত্য জীবনের প্রথম আদরের আশ্লেষে জড়িয়ে ধরেছিল ধ্রিতিমান…স্মৃতির চিলেকোঠায় যার নাম কাজরীর জীবনে টুয়ার বাবা হিসেবেই থেকে গেছে।
বাড়িটা হয়ত ভেঙে জাবে…অন্যসবাইয়ের মতো কাজরীর ও হয়ত মেনে নেওয়া ছাড়া রাস্তা থাকবে না..কিন্ত এই স্মৃতির অবসর টুকু কি তার গড়িয়ায় তৈরি হওয়া দু কামড়ার ফ্ল্যাট দিতে পারবে?